আমার শেরপুর ৫ মিনিটে পড়ুন
শ্রীবরদীর সীমান্তে গারো পাহাড়ের রাজার পাহাড় শেরপুর জেলার সবচেয়ে উঁচু টিলাগুলোর একটি। চূড়ার সমতল জমি থেকে চোখে পড়ে মেঘালয়ের পাহাড় আর সীমান্তের গ্রাম, পাশেই গারো-হাজং-কোচদের গ্রাম বাবেলাকোনা আর ঢেউফা নদী। যাওয়ার উপায়, খরচ, দেখার জায়গা আর হাতি ও নিরাপত্তা নিয়ে জরুরি সতর্কতা, সব এই গাইডে।
এক নজরে রাজার পাহাড়
| অবস্থান | সিংগাবরুনা ইউনিয়ন, শ্রীবরদী, শেরপুর; মেঘালয় সীমান্তে, কর্ণঝোড়া বাজারের সামান্য পূর্বে, ঢেউফা নদীর পাশে |
|---|---|
| শ্রীবরদী সদর থেকে | কর্ণঝোড়া বাজার ১৪ কিমি |
| শেরপুর শহর থেকে | কর্ণঝোড়া বাজার প্রায় ৩৪ কিমি |
| উচ্চতা | মাপা উচ্চতার কোনো প্রকাশিত তথ্য নেই; উপজেলা তথ্য বাতায়নের ভাষায় এখানকার গারো পাহাড়ে এটিই সবচেয়ে উঁচু |
| প্রবেশ ফি | নেই |
| বন বিভাগ | বালিজুড়ি রেঞ্জ |
| সেরা সময় | নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি |
নামের পেছনের কিংবদন্তি
স্থানীয় কিংবদন্তি বলে, প্রাচীনকালে এক রাজা এই পাহাড়ে বাস করতেন, সেই থেকে নাম রাজার পাহাড়। উপজেলা ও ইউনিয়নের তথ্য বাতায়নে একে “রাজা পাহাড়”ও বলা হয়েছে। তবে সেই রাজার নাম, শাসনকাল বা কোনো ধ্বংসাবশেষের ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না, তাই গল্পটিকে কিংবদন্তি হিসেবেই নেওয়া ভালো।
চূড়ায় কী আছে
পাহাড়ের চূড়ায় বিস্তীর্ণ সমতল জমি; উপজেলা তথ্য বাতায়নের হিসাবে শতাধিক হেক্টর। এখন এই জমিতে স্থানীয়রা মাল্টা, লেবু, পেঁপে, করলা, মরিচ, চিচিঙ্গা আর জলপাই চাষ করেন, গরুও চরে। চূড়া থেকে কর্ণঝোড়া, মালাকোচা, দিঘলাকোনা, বাবেলাকোনা, হারিয়াকোনাসহ সীমান্তের গ্রাম আর মেঘালয়ের পাহাড় দেখা যায়। ভিড় কম, তাই নিরিবিলিতে প্রকৃতি দেখার জায়গা। তথ্য বাতায়নেই অবশ্য স্বীকার করা হয়েছে, পাহাড়ের আগের সৌন্দর্য এখন আর পুরোপুরি নেই।
আশপাশে বন বিভাগের বিট অফিস, বিজিবি ক্যাম্প, রাবার বাগান আর কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার কার্যালয় আছে।
ছবি: Redmin · CC BY 4.0 · উৎস
বাবেলাকোনা আর ঢেউফা নদী
রাজার পাহাড় থেকে প্রায় দুই কিমি দূরে বাবেলাকোনা গ্রাম, যেখানে গারো, হাজং আর কোচ সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। এখানে আছে বাবেলাকোনা কালচারাল একাডেমি, ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়, জাদুঘর, পাঠাগার, গবেষণা বিভাগ ও মিলনায়তন। আছে মিশনারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাবেলাকোনা আদিবাসী উচ্চ বিদ্যালয়, গির্জা আর মন্দির। জাদুঘর বা একাডেমি খোলার সময় ও প্রবেশ ফির কোনো প্রকাশিত তথ্য পাওয়া যায়নি, তাই যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।
পাশ দিয়ে বয়ে গেছে খরস্রোতা ঢেউফা নদী। বর্ষায় নদী ভরে ওঠে, বছরের বেশির ভাগ সময় হেঁটেই পার হওয়া যায়; এখন নদীর ওপর দুটি সেতুও আছে। নদীর বড় বালুচরকে স্থানীয়রা মজা করে “বিকল্প সৈকত” বলেন।
ছবি: Redmin · CC BY 4.0 · উৎস
কীভাবে যাবেন
- ঢাকা থেকে শেরপুর: মহাখালী থেকে শেরপুরের বাসে (বিআরটিএর সেপ্টেম্বর ২০২৬ তালিকায় ৫১ আসনের নন-এসি বাসের ভাড়া রুটভেদে ৪৪১–৫৪৬ টাকা)।
- শেরপুর থেকে শ্রীবরদী: খোয়ারপাড় থেকে সিএনজি বা বাসে; ভ্রমণ সাইটের পুরোনো হিসাবে ভাড়া ২৫–৪৫ টাকা।
- শ্রীবরদী থেকে কর্ণঝোড়া বাজার: সিএনজি বা ভটভটিতে ৩০–৫০ টাকা (ইউনিয়ন তথ্য বাতায়ন ও ভ্রমণ সাইটের পুরোনো হিসাব)।
- কর্ণঝোড়া বাজার থেকে পাহাড়: তিন-চার কিমি; হেঁটে, ভ্যানে বা রিজার্ভ অটোতে (ভ্রমণ সাইটের তথ্যে ২০০–৫০০ টাকা)।
ঢাকার মহাখালী থেকে সরাসরি ভায়াডাঙ্গা ও কর্ণঝোড়ার বাসও চলে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়; সময় ও বিস্তারিত দেখুন উপজেলা থেকে ঢাকার বাস ও ট্রেন পোস্টে। পাহাড়ে ওঠার শেষ প্রায় এক কিমি কাঁচা ও উঁচু-নিচু রাস্তা, বর্ষায় কিছুটা কষ্টকর।
খরচ (জনপ্রতি, আনুমানিক)
| খাত | খরচ |
|---|---|
| ঢাকা–শেরপুর নন-এসি বাস (এক পথ) | ৪৪১–৫৪৬ টাকা (বিআরটিএ, সেপ্টেম্বর ২০২৬) |
| শেরপুর–শ্রীবরদী | ২৫–৪৫ টাকা (পুরোনো হিসাব) |
| শ্রীবরদী–কর্ণঝোড়া | ৩০–৫০ টাকা (পুরোনো হিসাব) |
| কর্ণঝোড়া থেকে রিজার্ভ অটো | ২০০–৫০০ টাকা প্রতি গাড়ি |
| প্রবেশ ফি | নেই |
স্থানীয় ভাড়ার হিসাবগুলো ২০২৬ সালের জ্বালানির দাম বাড়ার আগের; এখন কিছুটা বেশি হতে পারে।
কখন যাবেন
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি: রাস্তা শুকনো, আকাশ পরিষ্কার। বর্ষায় ঢেউফা নদী ভরে ওঠে আর শেষ কাঁচা রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে যায়।
নিরাপত্তা: যাওয়ার আগে অবশ্যই জানুন
ছবি: Amdadphoto · CC BY-SA 4.0 · উৎস
- বন্য হাতি: ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর শ্রীবরদীর বালিজুড়ি রেঞ্জের মালাকোচা বনে হাতি দেখতে যাওয়া এক ব্যক্তি হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা যান; তখন ৪০–৪২টি হাতির দল সেখানে অবস্থান করছিল। মালাকোচা গ্রাম রাজার পাহাড়ের চূড়া থেকেই দেখা যায়। হাতি দেখতে কখনো বনে যাবেন না, বনের কিনারা এড়িয়ে চলুন আর সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসুন।
- অপরিচিত “গাইড” থেকে সাবধান: ২০২৩ সালে এখানে পথ দেখানোর কথা বলে এক পর্যটক পরিবারের সঙ্গে গুরুতর অপরাধের ঘটনার খবর পত্রিকায় এসেছিল। দলবেঁধে যান, অপরিচিত কারও পথ দেখানোর প্রস্তাবে রাজি হবেন না আর শিশুদের সবসময় কাছে রাখুন।
- সীমান্ত: পাশেই বিজিবি ক্যাম্প। সীমান্তের কাছে সাবধানে চলুন, বিজিবির নির্দেশনা মানুন, পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন।
- পানি ও খাবার: পাহাড়ে কোনো দোকান বা পানির ব্যবস্থা নেই। পানি আর শুকনো খাবার সঙ্গে নিন, আবর্জনা ফেরত আনুন।
- স্থানীয় সংস্কৃতি: আদিবাসী গ্রামে শালীনভাবে চলুন, ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।
জরুরি নম্বর পাবেন শেরপুরের জরুরি নম্বর পোস্টে।
খাওয়া ও থাকা
- শ্রীবরদী উপজেলা ডাকবাংলো: ইউএনওর আগাম অনুমতি নিয়ে থাকা যায়।
- বন বিভাগের ডাকবাংলো: পাহাড়ের কাছে বন বিভাগের একটি ডাকবাংলো আছে; বুকিংয়ের নিয়ম বা ভাড়ার প্রকাশিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
- শ্রীবরদী বাজার: একটি বেসরকারি আবাসিক হোটেল আর কয়েকটি খাবার হোটেল আছে।
- শেরপুর শহর: হোটেলের তালিকা দেখুন শেরপুরের আবাসিক হোটেল ও রেস্ট হাউজ পোস্টে; ফেরার পথে শহরের বিখ্যাত ছানার পায়েসের খোঁজ পাবেন শেরপুরের বিখ্যাত খাবার পোস্টে।
আশপাশে আর কী দেখবেন
- কর্ণঝোড়া রাবার বাগান: পাহাড়ে যাওয়ার পথেই।
- গজনী অবকাশ কেন্দ্র: সড়কপথে আনুমানিক ১৫ কিমি পূর্বে, ঝিনাইগাতীতে।
- গড়জরিপা বারদুয়ারী মসজিদ: শ্রীবরদী সদর থেকে প্রায় ১০ কিমি পূর্বে, শেরপুর শহর থেকে প্রায় ৮ কিমি।
- লাউচাপড়া অবকাশ কেন্দ্র: বাবেলাকোনা থেকে প্রায় তিন কিমি পশ্চিমে, তবে এটি শেরপুরে নয়, জামালপুরের বকশীগঞ্জে।
এক দিনে রাজার পাহাড়, গজনী আর মধুটিলা ঘোরার রুট পাবেন শেরপুর ভ্রমণ পরিকল্পনা পোস্টে।
সূত্র
- শ্রীবরদী উপজেলা তথ্য বাতায়ন, “রাজা পাহাড়” (হালনাগাদ ১১ জানুয়ারি ২০২৬); শেরপুর জেলা তথ্য বাতায়ন: দর্শনীয় স্থান; সিংগাবরুনা ইউনিয়ন তথ্য বাতায়ন
- রূপালী বাংলাদেশ: সবুজ-নিরিবিলি রাজার পাহাড় (১৯ জুলাই ২০২৫)
- দ্য ডেইলি স্টার বাংলা: শ্রীবরদীতে হাতির আক্রমণে মৃত্যু (১৫ ডিসেম্বর ২০২৫)
- দৈনিক ইনকিলাব: রাজার পাহাড়ে পর্যটক পরিবারের সঙ্গে ঘটনা (১২ মার্চ ২০২৩)
- বিআরটিএ, মহাখালী থেকে আন্তঃজেলা বাস ভাড়ার তালিকা, সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ হালনাগাদ: অক্টোবর ২০২৬। রাজার পাহাড়ের কোনো মুক্ত লাইসেন্সের ছবি পাওয়া যায়নি, তাই পথের ও আশপাশের ছবি দেওয়া হয়েছে।