আমার শেরপুর ৬ মিনিটে পড়ুন
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি শেরপুরে পিকনিকের মৌসুম। গারো পাহাড়ের কোলে গজনী, মধুটিলা, পানিহাটা আর রাজার পাহাড় ছাড়াও জেলায় আছে আরও কিছু বেড়ানোর জায়গা। কোথায় যাবেন, প্রবেশ ফি আর পার্কিং কত, কী সুবিধা আছে, আর ২০২৫ সালের নতুন শব্দদূষণ বিধিমালায় পিকনিকে কী কী নিষেধ, সব এক জায়গায়।
প্রচ্ছদের ছবি: গজনী এলাকায় সবুজ মাঠে পিকনিকের ছাউনি। ছবি: Nahid Sultan · CC BY-SA 4.0 · উৎস
পিকনিকের আগে নতুন নিয়ম জেনে নিন
শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী:
- প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে বনভোজন নিষিদ্ধ।
- পিকনিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানের গাড়িতে উচ্চ শব্দে মাইক, লাউডস্পিকার, অ্যামপ্লিফায়ার বা মিউজিক সিস্টেম বাজানো যাবে না।
- প্রকাশ্য স্থানে লাউডস্পিকার বাজাতে লিখিত অনুমতি লাগবে: উপজেলায় ইউএনও, জেলা শহরে জেলা প্রশাসক। সর্বোচ্চ ৯০ ডেসিবেল, সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টা, রাত ১১টার পর নয়।
গজনী বা মধুটিলা এই নিষেধাজ্ঞার “প্রাকৃতিক বনাঞ্চল”-এর মধ্যে পড়ে কি না, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা পাওয়া যায়নি। তাই দলবেঁধে পিকনিকের পরিকল্পনা থাকলে আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনও বা মধুটিলার ক্ষেত্রে বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসে খোঁজ নিন, আর পাহাড়ে কোনো অবস্থাতেই উচ্চ শব্দে গান বাজাবেন না।
এক নজরে শেরপুরের পিকনিক ও বেড়ানোর জায়গা
| জায়গা | উপজেলা | শেরপুর শহর থেকে | প্রবেশ ফি |
|---|---|---|---|
| গজনী অবকাশ কেন্দ্র | ঝিনাইগাতী | প্রায় ৩০ কিমি | ২০ টাকা |
| মধুটিলা ইকোপার্ক | নালিতাবাড়ী | প্রায় ২৫–২৮ কিমি | ২০ টাকা |
| পানিহাটা-তারানি | নালিতাবাড়ী | প্রায় ৩৫–৪০ কিমি | নেই |
| রাজার পাহাড় ও বাবেলাকোনা | শ্রীবরদী | প্রায় ৩৪ কিমি | নেই |
| অর্কিড পর্যটন কেন্দ্র (কলাবাগান) | শেরপুর সদর | থানা মোড় থেকে প্রায় ৫ কিমি | জানা যায়নি |
| সন্ন্যাসীভিটা রাবার ড্যাম | নালিতাবাড়ী | প্রায় ২২ কিমি | জানা যায়নি |
| সুতানাল দীঘি | নালিতাবাড়ী (কাকরকান্দি) | — | মাছ ধরতে টিকিট |
| ব্রহ্মপুত্র সেতু (সাতপাকিয়া) | শেরপুর সদর | প্রায় ১২ কিমি | নেই |
১. গজনী অবকাশ কেন্দ্র (ঝিনাইগাতী)
ছবি: Redmin · CC BY 4.0 · উৎস
শেরপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় পিকনিকের জায়গা। প্রবেশ টিকিট জনপ্রতি ২০ টাকা, ওয়াচ টাওয়ার ১০ টাকা, রাইড ১০–১০০ টাকা। প্রথম আলোর জুন ২০২৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী পার্কিং ফি: বাস বা ট্রাক ৭০০ টাকা, মিনিবাস ৫০০, মাইক্রোবাস ৩০০, প্রাইভেট কার ২০০ টাকা। ভেতরে রান্নার বড় চুলা, খাবার পানি আর শৌচাগার আছে; প্রায় একশো দোকান, ক্যান্টিন আর কফি হাউজও আছে। রেস্ট হাউজ শুধু দিনের বেলা ভাড়া দেওয়া হয়; রাতে থাকার অনুমতি নেই। পিকনিক স্পট বুকিংয়ের প্রকাশিত কোনো নিয়ম বা ফি পাওয়া যায়নি, তাই আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বা ঝিনাইগাতী ইউএনও অফিসে খোঁজ নিন।
বিস্তারিত দেখুন গজনী অবকাশ কেন্দ্র ভ্রমণ গাইড।
২. মধুটিলা ইকোপার্ক (নালিতাবাড়ী)
ছবি: Shariful Islam Masum · CC BY-SA 4.0 · উৎস
বন বিভাগের ইকোপার্কে প্রবেশ ফি জনপ্রতি ২০ টাকা, ওয়াচ টাওয়ার ১০ টাকা, রাইড ২০–১০০ টাকা (২০২৫)। ২০২৪ সালে প্রবেশ ফি বাড়ানোর একটি নোটিশ দেওয়া হলেও ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি; ২০২৬ সালের ফি গেটে জেনে নিন। পার্কে কয়েকটি পিকনিক স্পট আর পরিবার নিয়ে পিকনিকের ব্যবস্থা আছে, গেটের সামনে ক্যান্টিন ও খাবার হোটেল। মহুয়া রেস্ট হাউজ ব্যবহারে জেলা প্রশাসকের অনুমতি লাগে, শুধু দিনের বেলা।
ছবি: Redmin · CC BY-SA 4.0 · উৎস
বিস্তারিত দেখুন মধুটিলা ইকোপার্ক ভ্রমণ গাইড।
৩. পানিহাটা-তারানি (নালিতাবাড়ী)
ভোগাই নদীর পাড়ে সীমান্তঘেঁষা টিলা, ওপারে মেঘালয়ের পাহাড়। এটি সাজানো পার্ক নয়: টিকিট নেই, শৌচাগার বা দোকানও নেই। সঙ্গে খাবার-পানি নিয়ে যান, সন্ধ্যার আগে ফিরুন আর সীমান্তের নিয়ম মানুন। বিস্তারিত: পানিহাটা-তারানি ভ্রমণ গাইড।
৪. রাজার পাহাড় ও বাবেলাকোনা (শ্রীবরদী)
শ্রীবরদীর সীমান্তে উঁচু টিলার চূড়ায় সমতল জমি আর পাশে গারো-হাজং-কোচদের গ্রাম বাবেলাকোনা। এখানেও কোনো সুবিধা নেই, আর এলাকাটিতে বন্য হাতির চলাচল আছে। বিস্তারিত: রাজার পাহাড় ভ্রমণ গাইড।
৫. শহরের কাছে আরও কিছু জায়গা
- অর্কিড পর্যটন কেন্দ্র (কলাবাগান): শেরপুর সদরের কান্দাপাড়ায়, শেরপুর-ঝিনাইগাতী সড়কের পাশে, থানা মোড় থেকে প্রায় ৫ কিমি। জেলা প্রশাসনের পর্যটন বিবরণে গাছের সারি, লন, শান-বাঁধানো পুকুরঘাট, খাঁচায় কিছু প্রাণী, ছাতা, ক্যান্টিন আর রেস্ট হাউজের কথা আছে। এটি ব্যক্তিমালিকানাধীন; প্রবেশ ফি ও বুকিংয়ের তথ্য আগে জেনে নিন।
- ব্রহ্মপুত্র সেতু (সাতপাকিয়া): শহর থেকে সিএনজিতে প্রায় ১২ কিমি। নদীর পাড়ে বিকেল কাটানোর জায়গা; পাড়ে নামার সময় সাবধান থাকুন।
- সন্ন্যাসীভিটা রাবার ড্যাম: নালিতাবাড়ীর বাঘবেড় ইউনিয়নে চেল্লাখালী নদীর ওপর। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের ঢলে এ এলাকার একটি বেইলি সেতু ভেসে গিয়েছিল; বর্ষায় এড়িয়ে চলুন।
- সুতানাল দীঘি: নালিতাবাড়ীর কাকরকান্দি ইউনিয়নে প্রায় ৬০ একরের দিঘি; সমবায় সমিতির টিকিটে মাছ ধরা যায়।
- মায়াকুঞ্জ: নকলার গণপদ্দী ইউনিয়নে, শেরপুর থেকে প্রায় ১৪ কিমি পূর্বে বিশ্বরোডের পাশে বলে উপজেলা তথ্য বাতায়নে উল্লেখ আছে; সুবিধাগুলো আগে জেনে নিন।
গজনীর পাশে একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন ফরেস্ট রিসোর্টে পিকনিক স্পট ভাড়া দেওয়া হয় বলে ভ্রমণ সাইটগুলো জানায়; ভাড়া ও বুকিংয়ের নির্ভরযোগ্য তথ্য না পাওয়ায় এখানে দেওয়া হলো না।
ঐতিহাসিক স্থান: পথে থেমে দেখুন, পিকনিক নয়
ছবি: Salauddin Ahmed Sufol · CC BY-SA 4.0 · উৎস
- ঘাগড়া খান বাড়ি জামে মসজিদ (ঝিনাইগাতী): মোগল আমলের এক গম্বুজ মসজিদ, শিলালিপিতে ১০২৮ হিজরি (১৬১৮–১৯ সাল)। ১৯৯৯ সাল থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। গজনী যাওয়ার পথে, শেরপুর শহর থেকে প্রায় ১৬ কিমি। এখানে পিকনিক নয়; শালীন পোশাকে, নামাজের সময় এড়িয়ে যান।
- গড়জরিপা বারদুয়ারী মসজিদ (শ্রীবরদী): শেরপুর শহর থেকে প্রায় ৮ কিমি।
- বারোমারি মিশন (নালিতাবাড়ী): তীর্থস্থান, পিকনিকের জায়গা নয়। ২০২৬ সালে তীর্থযাত্রা ২৯–৩০ অক্টোবর, তখন প্রচুর ভিড় হয়।
যেসব জায়গায় পিকনিকে যাবেন না
- দাওধারা-কাটাবন (নালিতাবাড়ী): এখানে পর্যটনকেন্দ্র বানানোর কাজ বন বিভাগের আপত্তিতে বন্ধ হয়েছে; ২০২৫ সালে পরিবেশ উপদেষ্টা জানান, বনভূমিতে পর্যটনকেন্দ্র হবে না, বরং হাতির অভয়ারণ্যের পরিকল্পনা আছে।
- নয়াবাড়ির টিলা (শ্রীবরদী): জেলা প্রশাসনের বিবরণে এটি বন্য হাতির অভয়ারণ্য।
- লাউচাপড়া: জনপ্রিয় হলেও এটি শেরপুরে নয়, জামালপুরের বকশীগঞ্জে, শ্রীবরদী সীমান্তের পাশে।
পিকনিকের চেকলিস্ট
- শীতের ছুটির দিনে ভিড় বেশি থাকে; বাস ও হোটেল আগে বুক করুন।
- বাস নিয়ে গেলে গজনীতে পার্কিংয়ের জন্য ৭০০ টাকা রাখুন।
- গজনী আর মধুটিলা এক দিনে ঘুরতে সারা দিনের জন্য সিএনজি বা অটো রিজার্ভ নিলে প্রায় ৮০০–১,০০০ টাকা লাগে (বাসস, জানুয়ারি ২০২৫); মাইক্রোবাস ভাড়া ৩,০০০–৫,০০০ টাকা।
- পাহাড়ি এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হতে পারে, নগদ টাকা সঙ্গে রাখুন।
- বাসে বা পিকনিক স্পটে উচ্চ শব্দে গান বাজাবেন না।
- সন্ধ্যার আগে পাহাড় ছাড়ুন; গজনী বা মধুটিলায় রাতে থাকার অনুমতি নেই।
- হাতি বা বানরকে খাবার দেবেন না, কাছে যাবেন না; আবর্জনা সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।
থাকার জায়গার জন্য দেখুন শেরপুরের আবাসিক হোটেল ও রেস্ট হাউজ, যাতায়াতের জন্য শেরপুরের বাসের সময়সূচি, আর জরুরি প্রয়োজনে শেরপুরের জরুরি নম্বর।
সূত্র
- শব্দদূষণ বিধিমালা ২০২৫: বিডিনিউজ২৪ (২৬ নভেম্বর ২০২৫), প্রথম আলো (২২ ডিসেম্বর ২০২৫), বাংলা ট্রিবিউন (৬ আগস্ট ২০২৬)
- গজনীর ফি ও পার্কিং: প্রথম আলো (৯ জুন ২০২৫)
- মধুটিলা: বাসস (১৪ জানুয়ারি ২০২৫)
- দাওধারা: বাংলা ট্রিবিউন (২৬ মে ২০২৫)
- শেরপুর জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন তথ্য বাতায়ন: দর্শনীয় স্থান
সর্বশেষ হালনাগাদ: অক্টোবর ২০২৬। ফি ও নিয়ম বদলাতে পারে; যাওয়ার আগে জেনে নিন।