আমার শেরপুর ৭ মিনিটে পড়ুন
শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে গারো পাহাড়ের সীমান্তঘেঁষা শাল-গজারির বনে বন বিভাগের পরিবেশ-উদ্যান মধুটিলা ইকোপার্ক। শতফুট উঁচু ওয়াচ টাওয়ার থেকে মেঘালয়ের পাহাড় দেখা, লেকে প্যাডেল বোট, বনের ভেতরের সিঁড়িপথ আর শিশুপার্ক মিলিয়ে পরিবার নিয়ে এক দিনের ভ্রমণের চমৎকার জায়গা। কীভাবে যাবেন, টিকিট কত, কী দেখবেন আর কী সতর্কতা মানবেন, সব এই গাইডে।
প্রচ্ছদের ছবি: মধুটিলার টিলা থেকে দেখা সবুজ বন আর দিগন্ত। ছবি: Redmin · CC BY-SA 4.0 · উৎস
এক নজরে মধুটিলা ইকোপার্ক
| অবস্থান | পোড়াগাঁও ইউনিয়ন, নালিতাবাড়ী, শেরপুর; ভারত সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ের পাদদেশে |
|---|---|
| পরিচালনায় | বন অধিদপ্তর, ময়মনসিংহ বন বিভাগের মধুটিলা রেঞ্জ |
| ইকোপার্ক ঘোষণা | ১৯৯৯ সাল (কিছু সূত্রে ১৯৯৭ বা ২০০০) |
| আয়তন | প্রায় ৩৮০ একর বনভূমি |
| শেরপুর শহর থেকে | প্রায় ২৫–২৮ কিমি, সিএনজিতে এক ঘণ্টার মতো |
| ঢাকা থেকে | প্রায় ২০০ কিমি |
| প্রবেশ টিকিট | জনপ্রতি ২০ টাকা (২০২৫) |
| ওয়াচ টাওয়ার | জনপ্রতি ১০ টাকা |
| রাইড | ২০–১০০ টাকা |
| রাতে থাকা | সম্ভব নয়; সন্ধ্যার আগে ফিরতে হয় |
| সেরা সময় | নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি |
মধুটিলা ইকোপার্কের পরিচয়
নালিতাবাড়ী উপজেলার উত্তরে, মেঘালয় সীমান্তের কোলঘেঁষা গারো পাহাড়ের প্রায় ৩৮০ একর প্রাকৃতিক শালবনকে ঘিরে বন বিভাগ ১৯৯৯ সালে মধুটিলাকে ইকোপার্ক হিসেবে গড়ে তোলে। উদ্দেশ্য ছিল বন আর বন্যপ্রাণী রক্ষার পাশাপাশি পর্যটকদের প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে আসা। পার্কটি ময়মনসিংহ বন বিভাগের মধুটিলা রেঞ্জের শমশ্চূড়া বিটের অধীনে।
গজনীর মতো এখানে রাইডের ভিড় কম, প্রকৃতি বেশি। উঁচু-নিচু টিলা, ঘন গাছপালা, পাখির ডাক আর টাওয়ার থেকে সীমান্তের ওপারের নীলচে পাহাড়সারি, এগুলোই মধুটিলার আসল আকর্ষণ। আশপাশে গারো, হাজং আর কোচ জনগোষ্ঠীর বসবাস।
ছবি: Nishit Ghosh TurXo · CC BY-SA 4.0 · উৎস
মধুটিলায় কী কী দেখবেন
ওয়াচ টাওয়ার
পার্কের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী টাওয়ারটি ১০০ ফুটের বেশি উঁচু। ওপরে উঠলে চারদিকে দিগন্তজোড়া সবুজ বন আর উত্তরে মেঘালয়ের পাহাড় দেখা যায়। পরিষ্কার দিনে দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর। টিকিট জনপ্রতি ১০ টাকা।
ছবি: Sharifshabbir · CC BY-SA 4.0 · উৎস
ছবি: Redmin · CC BY-SA 4.0 · উৎস
লেক আর প্যাডেল বোট
পার্কের ভেতরের কৃত্রিম লেকে আলাদা টিকিট কেটে প্যাডেল বোটে ঘোরা যায়। লেকের পাড়ে বসার জায়গা আর পশুপাখির ভাস্কর্য। লেকের ওপর আছে স্টার ব্রিজ আর মিনি ব্রিজ।
ছবি: Md. Rafiqul Islam Susongi · CC BY-SA 4.0 · উৎস
বনের ভেতরের সিঁড়িপথ
টিলাগুলো জুড়ে আছে সিঁড়ি আর হাঁটার পথ। ধীরে ধীরে হাঁটলে নানা প্রজাতির গাছ, পাখি আর প্রজাপতি চোখে পড়ে। আরামদায়ক জুতা পরে যান, পানি সঙ্গে রাখুন।
ছবি: Asim Nabil · CC BY-SA 4.0 · উৎস
মিনি চিড়িয়াখানা, ভাস্কর্য আর শিশুপার্ক
পার্কের ভেতরে হাতি, সিংহ, মৎস্যকন্যাসহ নানা প্রাণীর ভাস্কর্য আর ছোট একটি চিড়িয়াখানা আছে (আগের প্রতিবেদনে হরিণ, বানর, খরগোশ, পাখির কথা বলা হয়েছে)। শিশুদের জন্য দোলনা, মিনি ট্রেনসহ শিশুপার্ক। আরও আছে ঔষধি গাছ ও গোলাপের বাগান, তথ্যকেন্দ্র, ক্যান্টিন আর পার্কিং।
মহুয়া রেস্ট হাউজ
টিলার ওপরে বন বিভাগের ‘মহুয়া’ রেস্ট হাউজ শুধু দিনের বেলা ব্যবহারের জন্য, পর্যটকদের রাতে থাকার অনুমতি নেই। বাসসের জানুয়ারি ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী দিনের বেলা কক্ষপ্রতি ভাড়া ৫০০–১,০০০ টাকা; আগে থেকে বন বিভাগ বা জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়।
ছবি: Redmin · CC BY-SA 4.0 · উৎস
টিকিট ও খরচ
| খাত | খরচ (২০২৫) |
|---|---|
| প্রবেশ টিকিট | জনপ্রতি ২০ টাকা |
| ওয়াচ টাওয়ার | জনপ্রতি ১০ টাকা |
| রাইড | ২০–১০০ টাকা |
| প্যাডেল বোট | আলাদা টিকিট (গেটে জেনে নিন) |
| মহুয়া রেস্ট হাউজ (দিনের বেলা) | কক্ষপ্রতি ৫০০–১,০০০ টাকা |
ফি বদলাতে পারে: ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকার দেশের ইকোপার্কগুলোর প্রবেশ ফি বাড়িয়ে প্রাপ্তবয়স্ক ১০০ টাকা আর শিশু ৫০ টাকা করার ঘোষণা দেয়। ময়মনসিংহ বন বিভাগ তখন জানায়, ইজারার মেয়াদ থাকায় মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত মধুটিলায় পুরোনো ফি চলবে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও জুনের প্রতিবেদনেও টিকিট ২০ টাকা বলা হয়েছে; তবে যাওয়ার আগে হালনাগাদ ফি জেনে নিন। খোলা-বন্ধের নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশিত নেই; পার্ক দিনের বেলা খোলা থাকে, সন্ধ্যার আগে বের হয়ে আসুন।
ঢাকা থেকে মধুটিলা যাওয়ার উপায়
ধাপ ১: ঢাকা থেকে শেরপুর বা নালিতাবাড়ী
মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে শেরপুরের বাস সারা দিন ছাড়ে (বিআরটিএর সেপ্টেম্বর ২০২৬ তালিকায় নন-এসি ৪৪১–৫৪৬ টাকা, এসি সাধারণত ৬০০–৭০০ টাকা)। মহাখালী থেকে সরাসরি নালিতাবাড়ীর বাসও আছে (হাজী, ভূঁইয়া, লুবনা, সিরাত, মাকসিমসহ কয়েকটি নন-এসি বাস; সরকারি ভাড়া ৪৬১ টাকা)। সব বাসের সময়সূচি আর নম্বর দেখুন শেরপুর বাস সময়সূচি ও ভাড়া লেখায়।
ধাপ ২: শেরপুর বা নালিতাবাড়ী থেকে মধুটিলা
- শেরপুর শহর থেকে: বাসস্ট্যান্ড থেকে অটোতে খোয়ারপাড় শাপলা চত্বর (জনপ্রতি প্রায় ১০ টাকা)। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোতে মধুটিলা (জনপ্রতি প্রায় ৫০–৭০ টাকা), প্রায় এক ঘণ্টা।
- সারা দিনের রিজার্ভ: গজনী আর মধুটিলা একসঙ্গে ঘুরতে অটো বা সিএনজি রিজার্ভ নিন। বাসসের জানুয়ারি ২০২৫-এর হিসাবে খরচ প্রায় ৮০০–১,০০০ টাকা (৬–৭ জন), দরদাম সাপেক্ষে।
- নালিতাবাড়ী থেকে: নালিতাবাড়ী শহর বা নন্নী বাজার থেকে অটো, সিএনজি বা মোটরসাইকেলে মধুটিলা।
গজনী অবকাশ কেন্দ্র থেকে মধুটিলা সড়কপথে আনুমানিক ১৪ কিমি, তাই একই দিনে দুটোই ঘোরা সহজ। গজনীর বিস্তারিত পড়ুন গজনী অবকাশ কেন্দ্র ভ্রমণ গাইডে।
কোথায় খাবেন, কোথায় থাকবেন
পার্কের ভেতরে ক্যান্টিন আর প্রবেশপথের আশপাশে অনেকগুলো দোকানে হালকা খাবার, চা আর পানি পাওয়া যায়। ভারী খাবারের জন্য নালিতাবাড়ী বা শেরপুর শহরের হোটেল ভালো। পার্কে বা কাছাকাছি রাতে থাকার ব্যবস্থা নেই; থাকতে হবে শেরপুর শহরে। হোটেলের তালিকা, ভাড়া আর ফোন নম্বর দেখুন শেরপুরের আবাসিক হোটেল ও রেস্ট হাউজ লেখায়। ফেরার পথে শেরপুরের ছানার পায়েস নিতে ভুলবেন না।
কখন যাবেন
আকাশ পরিষ্কার থাকায় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি টাওয়ার থেকে পাহাড় দেখার সেরা সময়, আবহাওয়াও আরামদায়ক। বর্ষায় বন সবচেয়ে সবুজ থাকে, তবে পথ পিচ্ছিল হয়। ছুটির দিনে ভিড় বেশি; সপ্তাহের মাঝে সকালে গেলে শান্ত পরিবেশ পাবেন।
ছবি: Asim Nabil · CC BY-SA 4.0 · উৎস
সতর্কতা: বন্য হাতি আর সীমান্ত
- দিনের আলো থাকতেই ফিরুন: মধুটিলা বন্য হাতির চলাচলের এলাকা। ২০২৫ সালে ৪০–৫০টি হাতির একটি পাল নালিতাবাড়ীর সীমান্তবর্তী গ্রামে হানা দেয়, ২৯ মে একজন নারী মারা যান। হাতি সাধারণত সন্ধ্যার পর আর রাতে নামে, বিশেষ করে বোরো ধান কাটার মৌসুমে (মে–জুন)।
- হাতি দেখলে: কাছে যাবেন না, শব্দ করে বা ছবি তুলতে গিয়ে বিরক্ত করবেন না। নিরাপদ দূরত্বে সরে স্থানীয়দের বা ৯৯৯-এ জানান।
- সীমান্ত: পাহাড়ের ওপারেই ভারত। সীমান্ত পিলারের দিকে বা গভীর বনে যাবেন না; বিজিবির নির্দেশনা মেনে চলুন।
- পরিবেশ রক্ষা: এটি সংরক্ষিত বন। গাছ কাটা, পাখি বা প্রাণী ধরা আর প্লাস্টিক ফেলা নিষেধ।
নালিতাবাড়ী থানা, ফায়ার সার্ভিস আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নম্বর পাবেন শেরপুর জেলার জরুরি নম্বর লেখায়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯।
মধুটিলার কাছে আর কী দেখবেন
- বারোমারি মিশন (মধুটিলা থেকে প্রায় সাড়ে ৬ কিমি): ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্যাথলিক মিশন, ১৯৯৮ থেকে তীর্থস্থান। প্রতি বছর অক্টোবরের শেষ বৃহস্পতি ও শুক্রবার ফাতেমা রানীর তীর্থোৎসবে হাজারো মানুষের ভিড় হয় (২০২৬ সালে ২৯–৩০ অক্টোবর হওয়ার কথা)।
- নাকুগাঁও স্থলবন্দর: ভারতের ডালু সীমান্তের বিপরীতে, নালিতাবাড়ী থেকে প্রায় ১০ কিমি উত্তরে।
- পানিহাটা-তারানি: ভোগাই নদীর স্বচ্ছ পানি আর মেঘালয়ের পাহাড়ের দৃশ্য।
- গজনী অবকাশ কেন্দ্র (ঝিনাইগাতী): ক্যাবল কার, জিপ লাইন, লেক আর টাওয়ার।
ছবি: George achik · CC BY-SA 4.0 · উৎস
এক বা দুই দিনে সব কীভাবে ঘুরবেন আর খরচ কত, দেখুন শেরপুর ভ্রমণ পরিকল্পনা।
সাধারণ প্রশ্ন
মধুটিলা ইকোপার্কের টিকিটের দাম কত?
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী প্রবেশ টিকিট জনপ্রতি ২০ টাকা, ওয়াচ টাওয়ার ১০ টাকা আর রাইড ২০–১০০ টাকা। ফি বদলাতে পারে, গেটে জেনে নিন।
শেরপুর শহর থেকে মধুটিলা কত দূর?
প্রায় ২৫–২৮ কিলোমিটার। সিএনজি বা অটোতে এক ঘণ্টার মতো লাগে।
মধুটিলা ইকোপার্ক কোথায়?
শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নে, ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ে।
মধুটিলায় কি রাতে থাকা যায়?
না। মহুয়া রেস্ট হাউজ শুধু দিনের বেলা ভাড়া দেওয়া হয়। রাতে শেরপুর শহরের হোটেলে থাকতে হবে।
গজনী আর মধুটিলা কি একদিনে ঘোরা যায়?
হ্যাঁ। দুটির দূরত্ব সড়কপথে আনুমানিক ১৪ কিমি। শেরপুর থেকে সারা দিনের জন্য সিএনজি রিজার্ভ নিয়ে সকালে গজনী, দুপুরের পর মধুটিলা ঘুরে সন্ধ্যার আগে শহরে ফেরা যায়।
মধুটিলার ওয়াচ টাওয়ার কত উঁচু?
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী ১০০ ফুটের বেশি। ওপর থেকে মেঘালয়ের পাহাড় দেখা যায়।
তথ্যসূত্র
- বাসস — মধুটিলা ইকোপার্ক ভ্রমণ (জানুয়ারি ২০২৫): bssnews.net
- দৈনিক জনকণ্ঠ — শেরপুরের মধুটিলা ইকোপার্ক (জুন ২০২৫): dailyjanakantha.com
- প্রথম আলো — শেরপুরের পাহাড়-বন নিয়ে প্রতিবেদন (ডিসেম্বর ২০২৪, সেপ্টেম্বর ২০২৫ ও সেপ্টেম্বর ২০২৬): prothomalo.com
- ঢাকা ট্রিবিউন — ইকোপার্কের প্রবেশ ফি বৃদ্ধি (জুলাই ২০২৪): dhakatribune.com
- বিডিনিউজ২৪ — নালিতাবাড়ী-ঝিনাইগাতীতে বন্য হাতি (জুন ২০২৫): bdnews24.com
- বিডিনিউজ২৪ — বারোমারি তীর্থোৎসব (অক্টোবর ২০২৫): bdnews24.com
- বন অধিদপ্তর — মধুটিলা ইকোপার্ক: bforest.gov.bd
- উইকিপিডিয়া — মধুটিলা ইকোপার্ক: bn.wikipedia.org
সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬। টিকিট বা নিয়ম বদলে গেলে আমাদের জানান, যাচাই করে ঠিক করে দেব।