আমার শেরপুর ৬ মিনিটে পড়ুন
ঢাকা থেকে মাত্র সাড়ে চার-পাঁচ ঘণ্টার পথ। গারো পাহাড়, শালবন, সীমান্তের নদী আর আদিবাসী গ্রাম মিলিয়ে শেরপুর এক বা দুই দিনের ছুটির জন্য দারুণ জায়গা। কোন দিন কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন-খাবেন আর জনপ্রতি খরচ কত পড়বে, সব হিসাবসহ এই পরিকল্পনায়।
প্রচ্ছদের ছবি: নালিতাবাড়ীর তারানি-পানিহাটায় মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা ভোগাই নদী। ছবি: George achik · CC BY-SA 4.0 · উৎস
এক নজরে শেরপুর ভ্রমণ
| ঢাকা থেকে সময় | বাসে সাড়ে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা |
|---|---|
| প্রধান দর্শনীয় স্থান | গজনী অবকাশ কেন্দ্র, মধুটিলা ইকোপার্ক, পানিহাটা-তারানি, বারোমারি মিশন, রাজার পাহাড় ও বাবেলাকোনা |
| কোথায় থাকবেন | শেরপুর শহর (পাহাড়ি এলাকায় রাতে থাকার ব্যবস্থা নেই) |
| স্থানীয় যাতায়াত | সারা দিনের জন্য রিজার্ভ সিএনজি বা অটো |
| এক দিনের খরচ (জনপ্রতি) | আনুমানিক ১,৫০০–২,০০০ টাকা |
| দুই দিনের খরচ (জনপ্রতি) | আনুমানিক ২,৫০০–৩,৫০০ টাকা |
| সেরা সময় | নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি |
খরচের হিসাব আনুমানিক, ২০২৫–২৬ সালের বাসভাড়া, টিকিট আর হোটেলভাড়ার তথ্য দিয়ে তৈরি; দলের আকার আর দরদামের ওপর বদলাবে।
প্ল্যান ১: এক দিনে গজনী ও মধুটিলা
সময় কম থাকলে এটাই সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যান। রাতের বাসে রওনা দিয়ে ভোরে শেরপুর পৌঁছান, সারা দিন ঘুরে রাতের বাসে ফিরুন।
| সময় | কী করবেন |
|---|---|
| রাত ১১টা–১২টা | ঢাকার মহাখালী থেকে শেরপুরের রাতের বাসে রওনা |
| ভোর ৫টা–৬টা | শেরপুর পৌঁছে নাশতা; বাসস্ট্যান্ড থেকে অটোতে খোয়ারপাড় শাপলা চত্বর |
| সকাল ৭টা | শাপলা চত্বর থেকে সারা দিনের জন্য সিএনজি বা অটো রিজার্ভ |
| সকাল ৮টা–১১টা | গজনী অবকাশ কেন্দ্র (প্রায় ৩০ কিমি): টাওয়ার, ক্যাবল কার, ঝুলন্ত সেতু, লেক |
| দুপুর ১২টা–১টা | ঝিনাইগাতী বা গজনীতে দুপুরের খাবার |
| দুপুর ১টা–৪টা | মধুটিলা ইকোপার্ক (গজনী থেকে সড়কপথে আনুমানিক ১৪ কিমি): ওয়াচ টাওয়ার, লেক, বনের পথ |
| বিকেল ৫টা | সন্ধ্যার আগে শেরপুর শহরে ফেরা; ছানার পায়েস কেনা |
| রাত ১০টা–১২টা | রাতের বাসে ঢাকায় ফেরা |
ছবি: Redmin · CC BY 4.0 · উৎস
প্ল্যান ২: দুই দিনে শেরপুরের পাহাড়-নদী
প্রথম দিন: নালিতাবাড়ী-ঝিনাইগাতীর সীমান্তপথ
প্রথম দিন গজনী থেকে শুরু করে সীমান্ত সড়ক ধরে পূর্ব দিকে মধুটিলা, বারোমারি, নাকুগাঁও আর পানিহাটা ঘুরে নালিতাবাড়ী হয়ে শহরে ফেরা।
| পথ | দূরত্ব (আনুমানিক) | কী দেখবেন |
|---|---|---|
| শেরপুর শহর → গজনী | ৩০ কিমি | অবকাশ কেন্দ্র, টাওয়ার, রাইড |
| গজনী → মধুটিলা | ১৪ কিমি | ইকোপার্ক, ওয়াচ টাওয়ার, লেক |
| মধুটিলা → বারোমারি মিশন | ৬.৫ কিমি | ১৯৪২ সালের ক্যাথলিক মিশন, পাহাড়ি তীর্থপথ |
| বারোমারি → নাকুগাঁও | ৫ কিমি | ভারতের ডালু সীমান্তের বিপরীতে স্থলবন্দর |
| নাকুগাঁও → পানিহাটা-তারানি | ৩–৫ কিমি | ভোগাই নদী, মেঘালয়ের পাহাড়, পানিহাটা মিশন |
| পানিহাটা → নালিতাবাড়ী → শেরপুর | প্রায় ৪০ কিমি | সন্ধ্যার আগে শহরে ফেরা |
দূরত্বগুলো ওপেনস্ট্রিটম্যাপের সড়ক হিসাব থেকে আনুমানিক; সিএনজিতে সময় গাড়ির চেয়ে বেশি লাগবে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, সীমান্ত সড়ক ধরে এসব জায়গা এক দিনে দেখা যায়, তবে সব জায়গায় সময় নিয়ে ঘুরতে চাইলে এক দিন যথেষ্ট নয়।
ছবি: Redmin · CC BY-SA 4.0 · উৎস
ছবি: George achik · CC BY-SA 4.0 · উৎস
দ্বিতীয় দিন: শ্রীবরদীর রাজার পাহাড় ও কর্ণঝোরা
- সকাল: শেরপুর থেকে বাস বা সিএনজিতে শ্রীবরদী, সেখান থেকে সিএনজিতে কর্ণঝোরা বা বালিজুরী বাজার। পথে কর্ণঝোরা রাবার বাগান।
- দুপুর: রাজার পাহাড়, জেলার গারো পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু টিলাগুলোর একটি, চূড়া সমতল। শেষের প্রায় এক কিলোমিটার পথ কাঁচা, বর্ষায় কঠিন।
- বিকেল: পাশের বাবেলাকোনা, গারো-হাজং-কোচ জনগোষ্ঠীর গ্রাম; এখানে বাবেলাকোনা কালচারাল একাডেমি, জাদুঘর আর পাঠাগার আছে।
- সন্ধ্যা: শহরে ফিরে ছানার পায়েস আর রাতের খাবার, তারপর রাতের বাসে ঢাকা।
ঢাকা থেকে সরাসরি শ্রীবরদী-ভায়াডাঙ্গা বা কর্ণঝোরাগামী বাসও আছে (মোজাদ্দেদিয়া, মমতা, শিহাব, জাবির), তাই চাইলে রাজার পাহাড় দিয়েও ভ্রমণ শুরু করা যায়।
ছবি: Redmin · CC BY 4.0 · উৎস
ছবি: Tanvir Rahat · CC BY-SA 4.0 · উৎস
খরচের হিসাব (জনপ্রতি)
| খাত | এক দিন | দুই দিন |
|---|---|---|
| ঢাকা–শেরপুর–ঢাকা বাস (নন-এসি) | ৯০০–১,১০০ | ৯০০–১,১০০ |
| বাসস্ট্যান্ড থেকে শাপলা চত্বর অটো | ২০ | ২০–৪০ |
| সিএনজি/অটো রিজার্ভের ভাগ (৬–৭ জন) | ১২০–১৭০ | ৩০০–৪০০ |
| প্রবেশ টিকিট ও টাওয়ার (গজনী + মধুটিলা) | ৬০ | ৬০ |
| রাইড | ১০০–২০০ | ১০০–২০০ |
| খাবার | ৩০০–৪৫০ | ৭০০–৯০০ |
| হোটেল (দুজনে এক কক্ষ ধরে) | — | ৩০০–৭৫০ |
| মোট (আনুমানিক) | ১,৫০০–২,০০০ | ২,৫০০–৩,৫০০ |
- বাসভাড়া: বিআরটিএর সেপ্টেম্বর ২০২৬ তালিকায় মহাখালী–শেরপুর নন-এসি ৪৪১–৫৪৬ টাকা (পথভেদে); এসি বাসে গেলে প্রতি পথে আরও ১০০–২৫০ টাকা বেশি ধরুন। বিস্তারিত: শেরপুর বাস সময়সূচি ও ভাড়া।
- সিএনজি রিজার্ভ: গজনী-মধুটিলার জন্য সারা দিনে প্রায় ৮০০–১,০০০ টাকা (বাসস, জানুয়ারি ২০২৫)। দুই দিনের প্ল্যানে প্রথম দিন সীমান্তপথে বেশি ঘুরলে ভাড়া বাড়বে, আগেই রুট বলে দরদাম করুন।
- টিকিট: গজনী ও মধুটিলা দুটোতেই প্রবেশ ২০ টাকা আর টাওয়ার ১০ টাকা (২০২৫)।
- হোটেল: শহরে নন-এসি কক্ষ প্রায় ৫০০–৮০০ টাকা, এসি ১,০০০–১,৫০০ টাকা। তালিকা: শেরপুরের আবাসিক হোটেল।
- ছানার পায়েস: কেজি প্রায় ৩৫০–৪০০ টাকা; বাড়ির জন্য নিতে চাইলে বাজেটে রাখুন।
খাওয়া-দাওয়া
সকালের নাশতা আর রাতের খাবার শেরপুর শহরে সারুন। নিউ মার্কেটের হোটেল শাহজাহান, রঘুনাথ বাজারের হোটেল আহারসহ শহরে বেশ কিছু পরিচিত রেস্তোরাঁ আছে। দুপুরে ঝিনাইগাতী বাজার বা গজনীর ক্যান্টিনে ভাত, দেশি মুরগি, ছোট মাছ আর ভর্তা পাওয়া যায়। আর অবশ্যই খাবেন শেরপুরের জিআই স্বীকৃত ছানার পায়েস; মুন্সী বাজারের ঘোষপট্টির পুরোনো দোকানগুলো বিখ্যাত।
কখন যাবেন, কখন এড়াবেন
- নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি: সেরা সময়। আকাশ পরিষ্কার, পাহাড় দেখা যায়, আবহাওয়া আরামদায়ক। তবে শুক্র-শনিবার পিকনিকের প্রচণ্ড ভিড়।
- বর্ষা (জুন–সেপ্টেম্বর): সবচেয়ে সবুজ, কিন্তু পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল আর কাঁচা রাস্তা কঠিন।
- অক্টোবরের শেষ বৃহস্পতি-শুক্রবার: বারোমারিতে ফাতেমা রানীর তীর্থোৎসব (২০২৬ সালে ২৯–৩০ অক্টোবর হওয়ার কথা)। হাজারো মানুষের ভিড়ে নালিতাবাড়ীর রাস্তায় যানজট হয়; উৎসব দেখতে না চাইলে এই দুদিন এড়িয়ে চলুন।
- ঈদের ছুটি: গজনী-মধুটিলায় সবচেয়ে বেশি ভিড়, রাইডে লম্বা লাইন।
জরুরি টিপস
- সন্ধ্যার আগে পাহাড় ছাড়ুন: গজনী, মধুটিলা আর সীমান্তের গ্রামগুলোয় বন্য হাতির চলাচল আছে; ২০২৫ সালে হাতির আক্রমণে কয়েকজন মারা গেছেন। অন্ধকারে বনের রাস্তায় থাকবেন না।
- সীমান্ত মেনে চলুন: পানিহাটা, নাকুগাঁও, গজনী সবই ভারত সীমান্তের কাছে। সীমান্ত পিলারের দিকে যাবেন না, বিজিবির নির্দেশনা মানুন। ভারতে যেতে চাইলে বৈধ ভিসা লাগবে (নাকুগাঁও–ডালু বন্দর)।
- আগে বুকিং: শীতের ছুটিতে হোটেল আর ফেরার বাসের টিকিট আগেই নিশ্চিত করুন।
- নগদ টাকা রাখুন: পাহাড়ি এলাকায় এটিএম আর মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হতে পারে।
- জরুরি নম্বর সেভ করুন: থানা, হাসপাতাল আর ফায়ার সার্ভিসের নম্বর পাবেন শেরপুর জেলার জরুরি নম্বর লেখায়।
সাধারণ প্রশ্ন
শেরপুর ভ্রমণে কত টাকা লাগে?
ঢাকা থেকে এক দিনে গজনী-মধুটিলা ঘুরতে জনপ্রতি আনুমানিক ১,৫০০–২,০০০ টাকা, আর হোটেলে এক রাত থেকে দুই দিনে ২,৫০০–৩,৫০০ টাকা (নন-এসি বাসে, ৬–৭ জনের দলে)।
এক দিনে শেরপুরের কোন কোন জায়গা ঘোরা যায়?
সবচেয়ে সহজ গজনী অবকাশ কেন্দ্র আর মধুটিলা ইকোপার্ক। হাতে সময় থাকলে বারোমারি মিশন আর পানিহাটাও যোগ করা যায়, তবে সন্ধ্যার আগে শহরে ফিরতে হবে।
শেরপুরে রাতে কোথায় থাকব?
শেরপুর শহরের আবাসিক হোটেলে। গজনী আর মধুটিলায় রাতে থাকার অনুমতি নেই। গজনীর কাছে ছোট বনরাণী ফরেস্ট রিসোর্টও আছে।
শেরপুরে ঘোরার জন্য কোন যানবাহন ভালো?
দলে গেলে খোয়ারপাড় শাপলা চত্বর থেকে সারা দিনের জন্য সিএনজি বা অটো রিজার্ভ নেওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক। বড় দলের জন্য মাইক্রোবাস।
শেরপুর যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় কখন?
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। ছুটির দিনের ভিড় এড়াতে সপ্তাহের মাঝে যান।
তথ্যসূত্র
- প্রথম আলো — শেরপুরের পাহাড়-বন নিয়ে প্রতিবেদন (ডিসেম্বর ২০২৪, জুন ২০২৫, সেপ্টেম্বর ২০২৫, সেপ্টেম্বর ২০২৬): prothomalo.com
- বাসস — মধুটিলা ইকোপার্ক ভ্রমণ (জানুয়ারি ২০২৫): bssnews.net
- বিআরটিএ — বাসভাড়ার তালিকা (সেপ্টেম্বর ২০২৬): brta.gov.bd
- শেরপুর জেলা তথ্য বাতায়ন — পানিহাটা-তারানি; শ্রীবরদী উপজেলা তথ্য বাতায়ন — রাজার পাহাড়
- বিডিনিউজ২৪ — বারোমারি তীর্থোৎসব (অক্টোবর ২০২৫) ও বন্য হাতি (২০২৫): bdnews24.com
- দূরত্ব: ওপেনস্ট্রিটম্যাপের সড়ক হিসাব (আনুমানিক)
সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬। খরচ বা তথ্য বদলে গেলে আমাদের জানান, যাচাই করে ঠিক করে দেব।