আমার শেরপুর ৭ মিনিটে পড়ুন
শেরপুরের নাম শুনলেই দুটি জিনিসের কথা মনে আসে: সুগন্ধি তুলশীমালা চাল আর শত বছরের পুরোনো ছানার পায়েস। দুটিই সরকারি নিবন্ধনে শেরপুরের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য। এই লেখায় থাকছে শেরপুরের বিখ্যাত খাবারগুলোর ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, দাম, আসল তুলশীমালা চেনার উপায় আর কোথায় কিনবেন।
প্রচ্ছদের ছবি: জেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মোড়কে শেরপুরের তুলশীমালা চাল। ছবি: Tanvir Rahat · CC BY-SA 4.0 · উৎস
এক নজরে শেরপুরের বিখ্যাত খাবার
| খাবার | পরিচিতি | কোথায় পাবেন |
|---|---|---|
| তুলশীমালা চাল | দেশের ১৪তম জিআই পণ্য (সনদ ২০২৩); ছোট, চিকন, সুগন্ধি চাল | স্মার্ট তুলশীমালা হাট, নয়আনী বাজারের চালের দোকান |
| ছানার পায়েস | দেশের ৪৪তম জিআই পণ্য (সনদ ২০২৪); শতবর্ষী মিষ্টি | ঘোষপট্টি-মুন্সিবাজার ও রঘুনাথ বাজারের মিষ্টির দোকান |
| মাষকলাইয়ের আমিত্তি | ডালের তৈরি রসে ভেজানো মিষ্টি; রমজানে ইফতারের প্রিয় পদ | ঘোষপট্টি-মুন্সিবাজারের মিষ্টির দোকান |
| নতুন আমনের পিঠা-পায়েস | পৌষ মেলা আর নবান্নের ঐতিহ্য | শীতে পৌষ মেলা ও বাড়ির উৎসবে |
তুলশীমালা চাল: শেরপুরের সুগন্ধি জিআই পণ্য
ছবি: Tanvir Rahat · CC BY-SA 4.0 · উৎস
তুলশীমালা শেরপুরের নিজস্ব সুগন্ধি ধান। পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) জিআই নিবন্ধনে এর নাম “শেরপুরের তুলশীমালা ধান”। নিবন্ধনের আবেদনপত্রে বলা হয়েছে, প্রাচীনকাল থেকে শেরপুরের কৃষকেরা রোপা আমন মৌসুমে এই ধান চাষ করে আসছেন; ঠিক কবে থেকে, তা জানা যায় না। স্থানীয়ভাবে একে আদর করে “জামাই আদুরী” চালও বলা হয়, কারণ নতুন জামাই এলে তুলশীমালার পোলাও-পায়েস রান্না হয়। পত্রিকায় নামটি অনেক সময় “তুলসীমালা” বানানে লেখা হয়।
জিআই নিবন্ধনের তথ্য
| নিবন্ধিত নাম | শেরপুরের তুলশীমালা ধান |
|---|---|
| আবেদনকারী | জেলা প্রশাসক, শেরপুর |
| আবেদন | জিআই-৩১, ১১ এপ্রিল ২০১৮ |
| নিবন্ধন নম্বর | ১৪ (দেশের ১৪তম জিআই পণ্য) |
| জিআই জার্নাল | সংখ্যা ১৩ (প্রকাশ ১৩ এপ্রিল ২০২৩) |
| সনদ | ১২ জুন ২০২৩ |
| মান তদারকি | কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর |
তুলশীমালা কেন আলাদা
- ছোট আর চিকন দানা: জিআই বিবরণ অনুযায়ী চাল সাদা, সুগন্ধি, চিকন ও খাটো। এক হাজার দানার ওজন মাত্র ১১ গ্রামের মতো।
- কালচে ধূসর ধান: পাকা ধানের রং কালচে ধূসর, যা সাধারণ ধান থেকে সহজে আলাদা করা যায়।
- দেরিতে পাকে: রোপা আমন মৌসুমের আলোক-সংবেদনশীল জাত। জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বীজ বোনা হয়, ধান পাকে ডিসেম্বরে (অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি থেকে পৌষের শুরু)।
- খরা সহিষ্ণু: জিআই বিবরণে একে খরা সহিষ্ণু ও দেরিতে চাষের উপযোগী বলা হয়েছে। ফলন হেক্টরে আড়াই থেকে তিন টন।
কোথায় চাষ হয়
শেরপুরের পাঁচ উপজেলাতেই তুলশীমালার চাষ হয়, সবচেয়ে বেশি নালিতাবাড়ী আর সদরে। বছরভেদে আবাদ প্রায় ৭ থেকে ১৪ হাজার হেক্টরের মধ্যে ওঠানামা করে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৫ সালের আমন মৌসুমে আবাদ হয়েছিল:
| উপজেলা | আবাদ (হেক্টর) |
|---|---|
| নালিতাবাড়ী | ৪,১৪৭ |
| শেরপুর সদর | ২,২২৫ |
| ঝিনাইগাতী | ১,২৩১ |
| নকলা | ৬৯১ |
| শ্রীবরদী | ৪২৫ |
| মোট | ৮,৭১৮ |
ছবি: Nahid Sultan · CC BY-SA 4.0 · উৎস
দাম কত
নতুন চাল সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাজারে আসে, বাকি সময় মজুত চাল বিক্রি হয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৩ সালে শেরপুর শহরের নয়আনী বাজারে খুচরা দাম ছিল কেজিপ্রতি ১১০ টাকা। ২০২৫ সালের আমন মৌসুমে প্রতি মণ তুলশীমালা ধান বিক্রি হয়েছে ২,২০০ থেকে ২,৪০০ টাকায়। চালের দাম মৌসুম আর মান অনুযায়ী বদলায়, তাই কেনার আগে বর্তমান দাম জেনে নিন।
আসল শেরপুরের তুলশীমালা চিনবেন কীভাবে
তুলশীমালা জাতটি শেরপুরের বাইরেও (যেমন খুলনায়) পরীক্ষামূলকভাবে চাষ হয়েছে। তাই বস্তায় শুধু “তুলশীমালা” লেখা থাকলেই তা শেরপুরের চাল নাও হতে পারে। কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন:
- দানা দেখুন: আসল তুলশীমালার চাল সাদা, ছোট ও চিকন, রান্নায় সুগন্ধ ছড়ায়। লম্বা দানার চাল তুলশীমালা নয়।
- সরকারি মোড়ক: জেলা প্রশাসন আর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মিলে এক কেজির মোড়কে চাল বাজারজাত করে, যাতে ক্রেতা না ঠকেন। মোড়কে জেলার লোগো, স্লোগান আর কিউআর কোড থাকে।
- সরকারি বিক্রয়কেন্দ্র: জেলা তথ্য বাতায়নে দেওয়া “স্মার্ট তুলশীমালা হাট”-এর হটলাইন ০১৮৩৭-৭২০২৩৩; প্রাপ্তিস্থান পারভেজ সুপার শপ, রঘুনাথ বাজার, শেরপুর শহর।
- নাম মিলিয়ে নিন: জিআই সুরক্ষা “শেরপুরের তুলশীমালা ধান”-এর জন্য, তাই উৎস জেনে কিনুন।
তুলশীমালা দিয়ে কী রান্না হয়
জিআই বিবরণ অনুযায়ী সারা বছর নানা অনুষ্ঠানে তুলশীমালা দিয়ে পোলাও, বিরিয়ানি, খিচুড়ি, ভাত আর পিঠা-পায়েস রান্না হয়। ছোট দানার কারণে পায়েস আর পোলাওয়ে এর সুগন্ধ সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায়।
জেলা প্রশাসন ২০১৮ সালে তুলশীমালা চালকে শেরপুরের ব্র্যান্ডিং পণ্য ঘোষণা করে। জেলার স্লোগানও এই চালকে ঘিরে: “পর্যটনের আনন্দে, তুলশীমালার সুগন্ধে শেরপুর”। ঝিনাইগাতীর গজনী অবকাশ কেন্দ্রের জেলা ব্র্যান্ডিং কর্নারে তুলশীমালা চাল প্রদর্শিত হয়; গজনী ঘোরার পরিকল্পনা থাকলে দেখুন গজনী অবকাশ কেন্দ্র ভ্রমণ গাইড।
ছানার পায়েস: শত বছরের ঐতিহ্য
ছবি: Tanvir Rahat · CC BY-SA 4.0 · উৎস
ছানার পায়েসের বয়স একশো বছরেরও বেশি। ব্রিটিশ আমলে শেরপুর শহরের ঘোষপট্টি (মুন্সিবাজার) এলাকার এক-দুটি দোকানে প্রথম এই মিষ্টি তৈরি হতো। তখন শেরপুরের জমিদারবাড়িগুলোতে, যেমন নয়আনী, তিনআনী, পৌনে তিনআনী, সাতআনী আর আড়াই আনী জমিদারবাড়িতে, ছানার পায়েসের কদর ছিল; জমিদারেরা কলকাতায়ও উপহার হিসেবে পাঠাতেন। জমিদারি প্রথা উঠে যাওয়ার পর এটি দোকানে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি শুরু হয়। এখন জেলা শহরে অন্তত ২০টি দোকানে ছানার পায়েস পাওয়া যায়, ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী, নকলা আর নালিতাবাড়ীতেও বিক্রি হয়।
জিআই স্বীকৃতি
| নিবন্ধিত নাম | শেরপুরের ছানার পায়েস |
|---|---|
| আবেদনকারী | জেলা প্রশাসক, শেরপুর |
| আবেদন | জিআই-৫৬, ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ |
| নিবন্ধন নম্বর | ৪৪ (দেশের ৪৪তম জিআই পণ্য, শেরপুরের দ্বিতীয়) |
| সনদ প্রদানের ঘোষণা | ৫ ডিসেম্বর ২০২৪ |
কীভাবে তৈরি হয়
দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে ক্ষীর বানানো হয়। আলাদাভাবে দুধ থেকে ছানা কেটে তাতে সামান্য ময়দা মিশিয়ে ছোট ছোট গুটি বানানো হয়। গুটিগুলো চিনির শিরায় ভিজিয়ে ক্ষীরে দিয়ে অল্প আঁচে জ্বাল দিলেই তৈরি ছানার পায়েস। এক কেজি পায়েসে লাগে প্রায় দুই কেজি দুধ, আধা কেজি চিনি, সামান্য ময়দা আর ১০–১৫ গ্রাম এলাচ। কারিগরদের মতে, ভালো স্বাদের জন্য টাটকা গরুর দুধ লাগে।
কোন দোকানে পাবেন, দাম কত
জাতীয় পত্রিকার প্রতিবেদনে যেসব দোকানের নাম এসেছে:
| দোকান | এলাকা |
|---|---|
| দুর্গাচরণ মিষ্টান্ন ভান্ডার | ঘোষপট্টি-মুন্সিবাজার |
| নন্দ গোপাল মিষ্টান্ন ভান্ডার | ঘোষপট্টি-মুন্সিবাজার |
| প্রেমানন্দ গ্র্যান্ড সন্স | ঘোষপট্টি-মুন্সিবাজার |
| অনুরাধা মিষ্টান্ন ভান্ডার | রঘুনাথ বাজার |
| চারু সুইটস | গোয়ালপট্টি মোড় |
| রাজবল্লভ মিষ্টান্ন ভান্ডার | শেরপুর শহর |
২০২৪ সালের শেষে ছানার পায়েসের দাম ছিল ধরনভেদে কেজিপ্রতি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। এখনকার দাম দোকানে জেনে নিন। গজনী বা মধুটিলা ঘুরতে আসা অনেকেই ফেরার পথে ছানার পায়েস কিনে নিয়ে যান।
ছবি: এম. এম রাফসান জামান (M. M. Rafsan Zaman) · CC BY-SA 4.0 · উৎস
মাষকলাইয়ের আমিত্তি: ইফতারের প্রিয় মিষ্টি
শেরপুরের আরেক ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি মাষকলাইয়ের আমিত্তি, স্থানীয়ভাবে “ডাইলের আমিত্তি”। মাষকলাই ডাল আর আতপ চালের গুঁড়া মিশিয়ে আমিত্তির আকারে ভেজে চিনির রসে ডোবানো হয়। প্রায় ১০০–১৫০ বছর ধরে শেরপুরে এই মিষ্টি তৈরি হচ্ছে; আগে দুর্গোৎসব আর ভাইফোঁটায় বানানো হতো, এখন রমজানে ইফতারের অন্যতম প্রিয় পদ। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৬ সালের রমজানে কেজিপ্রতি দাম ছিল প্রায় ২০০ টাকা, আর ঘোষপট্টি-মুন্সিবাজারের দোকানগুলোতে দিনে ৪০০–৫০০ কেজি বিক্রি হয়েছে। রমজানের সময়সূচি দেখুন শেরপুরে রমজান ২০২৭ সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি পোস্টে।
পৌষ মেলা, নবান্ন আর পিঠা-পায়েস
- পৌষ মেলা: শেরপুর শহরের নবীনগরে রয়া বিলের পাড়ে প্রায় দুইশো বছরের পুরোনো পৌষ মেলা বসে। মেলায় মুড়কি-মুড়ি, মোয়া, নিমকি আর গজার দোকান থাকে; এ সময় আত্মীয়স্বজন মিলে নতুন আমন চালের পিঠা-পায়েস খাওয়ার রেওয়াজ আছে।
- হাজংদের “নয়া খাওয়া”: নালিতাবাড়ীর হাজং গ্রামগুলোতে নবান্ন উৎসবে বিন্নি ধানের ভাপে রান্না করা “বিচি ভাত” তরকারি আর মাষকলাই ডালের সঙ্গে খাওয়া হয়।
- গারোদের ওয়ানগালা: ঝিনাইগাতীর গারো পাহাড়ি এলাকায় ওয়ানগালা উৎসবে নতুন ধানের চাল প্রথমে দেবতাকে উৎসর্গ করে তারপর খাওয়া হয়।
কোথায় কিনবেন
| কী | কোথায় |
|---|---|
| তুলশীমালা চাল (সরকারি মোড়ক) | স্মার্ট তুলশীমালা হাট, পারভেজ সুপার শপ, রঘুনাথ বাজার; হটলাইন ০১৮৩৭-৭২০২৩৩ |
| তুলশীমালা চাল (খোলা) | শেরপুর শহরের নয়আনী বাজারের চালের দোকান |
| ছানার পায়েস, আমিত্তি | ঘোষপট্টি-মুন্সিবাজার আর রঘুনাথ বাজারের মিষ্টির দোকান; অন্য চার উপজেলাতেও পাওয়া যায় |
দূরে পাঠাতে চাইলে: চাল কুরিয়ারে সহজে পাঠানো যায়। ছানার পায়েস দুধের মিষ্টি, তাই দূরে পাঠানোর আগে দোকান থেকে জেনে নিন কত দিন ভালো থাকবে আর কীভাবে প্যাক করতে হবে।
শেরপুর বেড়াতে এলে থাকার জায়গা খুঁজতে দেখুন শেরপুরের আবাসিক হোটেল ও রেস্ট হাউজ, আর পুরো ভ্রমণের পরিকল্পনার জন্য শেরপুর ভ্রমণ পরিকল্পনা।
সূত্র
- পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর: নিবন্ধিত জিআই পণ্যের তালিকা ও জিআই জার্নাল সংখ্যা ১৩
- শেরপুর জেলা তথ্য বাতায়ন: জেলা ব্র্যান্ডিং, স্মার্ট তুলশীমালা হাট হটলাইন
- বিডিনিউজ২৪: তুলশীমালা ধান এখন শেরপুরের জিআই পণ্য (১৬ জুন ২০২৩), জিআই স্বীকৃতি পেল শেরপুরের ছানার পায়েস (৫ ডিসেম্বর ২০২৪)
- প্রথম আলো: জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেল শেরপুরের তুলসীমালা ধান (২৫ জুন ২০২৩), হেমন্তের বাতাসে তুলসীমালা ধানের সুবাস (১১ ডিসেম্বর ২০২৫), শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ছানার পায়েস (৩০ জুন ২০২৩), ছানার পায়েস এখন জিআই পণ্য (৫ ডিসেম্বর ২০২৪), ইফতারে মাষকলাইয়ের আমিত্তি (১১ মার্চ ২০২৬)
- সমকাল: শেরপুরের ছানার পায়েস পেল জিআই স্বীকৃতি (৫ ডিসেম্বর ২০২৪)
- দ্য ডেইলি স্টার বাংলা: সুখ্যাতি-সুস্বাদে শেরপুরের ছানার পায়েস (৯ ডিসেম্বর ২০২৪)
- ঢাকা ট্রিবিউন: Tulsimala rice now cultivated in Khulna (১৩ এপ্রিল ২০২১)
- বাসস: শেরপুরে শেষ হলো প্রায় দুইশত বছরের ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলা (১০ জানুয়ারি ২০২৬); বিডিনিউজ২৪: হাজংদের নবান্ন উৎসব নয়া খাওয়া (২২ নভেম্বর ২০২৫)
সর্বশেষ হালনাগাদ: অক্টোবর ২০২৬। দাম সময়ের সঙ্গে বদলায়; কেনার আগে জেনে নিন।