মূল কনটেন্টে যান

শেরপুরের ঐতিহাসিক স্থান: ঘাগড়া মসজিদ, গড়জরিপা, জমিদারবাড়ি ও মাজার—কোথায়, কীভাবে যাবেন

ইতিহাস ও ঐতিহ্য · ১৭ অক্টোবর ২০২৬

শেরপুরের ঐতিহাসিক স্থান: ঘাগড়া মসজিদ, গড়জরিপা, জমিদারবাড়ি ও মাজার—কোথায়, কীভাবে যাবেন

আমার শেরপুর ১২ মিনিটে পড়ুন

শেয়ার করুন:

চারশো বছরের পুরোনো শিলালিপিওয়ালা মসজিদ, সুলতানি আমলের দুর্গনগরী গড়জরিপা, গ্রিক রীতির স্তম্ভে সাজানো জমিদারবাড়ি, আঠারো শতকের মন্দির, যাঁর নামে জেলার নাম সেই শের আলী গাজীর দরগা আর একাত্তরের গণহত্যার স্মৃতিস্থান: শেরপুরের ঐতিহাসিক জায়গাগুলো কোথায়, কোনটির পেছনে কী ইতিহাস, এখন কী অবস্থায় আছে আর কীভাবে যাবেন, সব এক গাইডে।

প্রচ্ছদের ছবি: ঝিনাইগাতীর ঘাগড়া খান বাড়ি জামে মসজিদ। ছবি: Salauddin Ahmed Sufol · CC BY-SA 4.0 · উৎস

শেরপুরের ইতিহাসের ধারাবাহিক গল্প পড়ুন শেরপুরের ইতিহাস লেখায়, আর জেলার সার্বিক পরিচিতি শেরপুর জেলা গাইডে। এখানে প্রতিটি জায়গার অবস্থান, ইতিহাস আর যাতায়াত। মনে রাখবেন, এর বেশির ভাগই চালু মসজিদ, মন্দির, মাজার বা সরকারি দপ্তর; টিকিট বা নির্দিষ্ট দর্শন-সময় নেই, তবে নামাজ-পূজার সময় আর স্থানীয়দের সুবিধার কথা মাথায় রেখে যেতে হবে।

এক নজরে শেরপুরের ঐতিহাসিক স্থান

স্থানউপজেলাকালশেরপুর শহর থেকে
ঘাগড়া খান বাড়ি জামে মসজিদঝিনাইগাতী১৬১৮–১৯ (শিলালিপি)প্রায় ১৬ কিমি
গড়জরিপা: দুর্গ, বারদুয়ারী মসজিদ, জরিপ শাহের মাজারশ্রীবরদীপনেরো শতক; মসজিদ পুনর্নির্মিত ১৯৮৪প্রায় ৬–৮ কিমি
মাইসাহেবা জামে মসজিদসদর (শহর)আনুমানিক আড়াইশো বছর; পুনর্নির্মিতশহরের ভেতরে
পৌনে তিন আনী জমিদারবাড়ি ও রংমহলসদর (শহর)ব্রিটিশ আমলশহরের ভেতরে
গোপীনাথ-অন্নপূর্ণা মন্দিরসদর (নবীনগর)১৭৮৩ (জেলা বাতায়ন; যাচাইসাপেক্ষ)শহরের ভেতরে
রঘুনাথ জিউর ও লোকনাথ মন্দিরসদর (শহর)রঘুনাথ জিউর ১৭৭১ (বাংলাপিডিয়া)শহরের ভেতরে
নয়আনী জমিদারবাড়ির স্থান ও নাটমন্দিরসদর (ডিসি অফিস এলাকা)আঠারো-উনিশ শতকশহরের ভেতরে
শাহ কামালের মাজারসদর১৫০৩ সালে আগমন (উপজেলা বাতায়ন)বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিমে
কসবার মোগল স্মৃতিসদর (কসবা)মোগল আমলশহরের ভেতরে
শের আলী গাজীর দরগাসদর (গাজীর খামার)নবাবি আমলপ্রায় ১০–১২ কিমি উত্তরে
রুনীগাঁওয়ের গাজীর দরগাহনকলাজনশ্রুতিতে মোগল আমল—
সুতানাল দিঘিনালিতাবাড়ীপ্রাচীন, সাল অজানানালিতাবাড়ী সদর থেকে প্রায় ৮ কিমি
সোহাগপুর বীরকন্যা পল্লী ও সৌরজায়ানালিতাবাড়ী১৯৭১—

দূরত্ব উপজেলা তথ্য বাতায়ন ও ওপেনস্ট্রিটম্যাপের সড়ক-হিসাব থেকে নেওয়া আনুমানিক মান। পথ চিনে নিতে আমাদের মানচিত্র কাজে লাগবে।

১. ঘাগড়া খান বাড়ি জামে মসজিদ (ঝিনাইগাতী)

অবস্থানখান বাড়ি, ঘাগড়া লস্কর গ্রাম, হাতিবান্ধা ইউনিয়ন, ঝিনাইগাতী
নির্মাণকাল১০২৮ হিজরি, অর্থাৎ ১৬১৮–১৯ খ্রিষ্টাব্দ (দরজার ওপরের আরবি শিলালিপি)
সংরক্ষণ১৯৯৯ সাল থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি
দূরত্বশেরপুর শহর থেকে সড়কপথে প্রায় ১৬ কিমি, ঝিনাইগাতী সদর থেকে প্রায় ১২ কিমি

শেরপুর জেলার তারিখসহ টিকে থাকা সবচেয়ে পুরোনো স্থাপনাগুলোর একটি। মোগল রীতির এক গম্বুজ মসজিদটি বাইরে থেকে প্রায় ৩০ ফুট বাই ৩০ ফুট, দেয়াল প্রায় চার ফুট পুরু (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। টালির মতো পাতলা চারকোনা ইট, ঝিনুকচূর্ণ-সুড়কির পলেস্তারা, চারপাশে ছোট ছোট মিনার আর মিহরাবের ফুলেল নকশা এর বৈশিষ্ট্য। ভেতরে একসঙ্গে ত্রিশজনের মতো নামাজ পড়তে পারেন।

নির্মাতা নিয়ে মতভেদ আছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় আজিমুল্লাহ খানের নাম আছে। জেলা তথ্য বাতায়নের লোককাহিনি বলে, কোনো রাজ্যের দুই সেনাপতি সহোদর পালানো খাঁ ও জব্বার খাঁ যুদ্ধে হেরে বনে আশ্রয় নিয়ে মসজিদটি গড়েন। জেলা বাতায়নে মসজিদটিকে “আনুমানিক ৬০০ বছর” পুরোনো বলা হলেও শিলালিপির তারিখ অনুযায়ী বয়স চারশো বছরের কিছু বেশি। বাংলা ও ইংরেজি উইকিপিডিয়ার জেলা নিবন্ধে “ঘাগড়া লস্কর বাড়ি মসজিদ (১৮০৮)” লেখা থাকলেও সেটি শিলালিপির সঙ্গে মেলে না।

ঘাগড়া খান বাড়ি মসজিদের দরজা ও দেয়ালের কারুকাজ
ঘাগড়া খান বাড়ি মসজিদের পূর্ব দিকের দরজা আর দেয়ালের পলেস্তারার কারুকাজ।
ছবি: Ayman Nakib Badhan · CC BY-SA 4.0 · উৎস

কীভাবে যাবেন: শেরপুর শহরের খোয়ারপাড় থেকে ঝিনাইগাতীগামী বাস বা সিএনজিতে উঠে ঘাগড়ার কাছে নামুন, সেখান থেকে রিকশা বা অটোতে খান বাড়ি। গজনী অবকাশ কেন্দ্রে যাওয়ার পথে থেমে দেখে নেওয়া যায়; পুরো রুট পাবেন গজনী ভ্রমণ গাইডে।

মনে রাখুন: এটি নিয়মিত নামাজ হওয়া মসজিদ। শালীন পোশাকে যান, নামাজের সময় ভেতরে ছবি তুলবেন না, পুরোনো দেয়াল-কারুকাজে হাত দেবেন না বা কিছু লিখবেন না। এখানে পিকনিক করা যায় না।

২. গড়জরিপা: দুর্গ, বারদুয়ারী মসজিদ ও জরিপ শাহের মাজার (শ্রীবরদী)

অবস্থানগড়জরিপা ইউনিয়ন, শ্রীবরদী
ইতিহাসকোচ রাজা দলিপ সামন্তের দুর্গ গড় দলিপা ১৪৯১ সালে সুলতানি সেনাপতি মজলিস খান হুমায়ুন দখল করেন
দূরত্বশ্রীবরদী সদর থেকে প্রায় ১০ কিমি পূর্বে; শেরপুর শহর থেকে প্রায় ৬–৮ কিমি (উইকিপিডিয়া ও উপজেলা বাতায়ন)
দেখার মতোবারদুয়ারী মসজিদ, জরিপ শাহের মাজার ও “গায়েবী পাথর”, কালিদহ সাগর

সুলতানি আমলে এটিই ছিল এ অঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্র। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার বিবরণে দুর্গনগরীটি প্রায় ১,১০০ একর জুড়ে ছিল, ঘিরে ছিল সাতটি মাটির প্রাচীর আর ছয়টি পরিখা, চার দিকে চারটি ফটক। মজলিস খান হুমায়ুনকে দুর্গের ভেতরেই সমাহিত করা হয়েছিল বলে উল্লেখ আছে। তবে আজ দুর্গের দৃশ্যমান অবশেষ কতটা টিকে আছে, তা নিশ্চিত নয়; উঁচু-নিচু মাটির ঢিবি ছাড়া বিশেষ কিছু চোখে না পড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

বারদুয়ারী মসজিদ: বারোটি দরজার জন্য এই নাম। জনশ্রুতি অনুযায়ী মূল মসজিদটি মাটির নিচে চাপা পড়েছিল। আশির দশকের শুরুতে মাওলানা আজিজুল হক জামালপুরীর খোঁজে ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, আর ১৯৮৪ সালে পুরোনো ভিতের ওপর বর্তমান তিন গম্বুজের মসজিদটি নতুন করে তৈরি হয় (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। তাই এখন যে ভবন দেখবেন, সেটি নতুন; পুরোনো শুধু ভিত আর জায়গাটির ইতিহাস। ইউনিয়ন তথ্য বাতায়নে মসজিদটির নাম “গড়জরিপা সাহী বারদুয়ারী মসজিদ”।

জরিপ শাহের মাজার ও কালিদহ সাগর: যে সুফি সাধকের নামে গড়জরিপা, তাঁর মাজার কালিদহ সাগরের পূর্ব পাড়ে। লোককাহিনি বলে, মনসামঙ্গলের চাঁদ সওদাগরের ডিঙা এই কালিদহেই ডুবেছিল; এটি কাব্য-কিংবদন্তি, ইতিহাস নয়। উইকিপিডিয়ায় আরও আছে, রাজা দলিপের মায়ের স্মরণে বৈশাখে এখানে বার্ষিক মেলা হয়।

কীভাবে যাবেন: শ্রীবরদী উপজেলা তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী সরাসরি গাড়ি নেই; শেরপুর বা শ্রীবরদী থেকে সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রিজার্ভ নিতে হয়, কুরুয়া বাজার থেকেও অটো পাওয়া যায়। ভাড়ার প্রকাশিত তথ্য নেই, রওনা দেওয়ার আগে দরদাম করে নিন।

৩. মাইসাহেবা জামে মসজিদ (শেরপুর শহর)

অবস্থানশেরপুর সরকারি কলেজের পাশে, কলেজ মোড়-তিনআনী বাজার থেকে জামালপুর বাসস্ট্যান্ড রোডে
কালজেলা বাতায়নে আনুমানিক আড়াইশো বছর; বাংলাপিডিয়ার সদর উপজেলা নিবন্ধে ১৮৬১ সাল
বর্তমান রূপআধুনিক নকশায় তিনতলা করে পুনর্নির্মিত, দুটি সুউচ্চ মিনার

জেলার সবচেয়ে বড় ও পরিচিত মসজিদ; দূর থেকে চোখে পড়ে এর দুটি মিনার। পুরোনো মসজিদটি এখন আর নেই, তার জায়গায় আধুনিক বহুতল মসজিদ। ধারণক্ষমতা নিয়ে সূত্রভেদ আছে: জেলা প্রশাসকের লেখায় প্রায় নয় হাজার, উইকিপিডিয়ায় ছয় হাজারের বেশি। সামনের খোলা জায়গায় শহরের বড় ঈদের জামাত হয়। তিনআনী জমিদারের আমলে এক নারী উপাসককে ঘিরে মসজিদের নামকরণের লোককাহিনি প্রচলিত আছে, তবে তার কোনো লিখিত ঐতিহাসিক সূত্র নেই।

শেরপুরের মাইসাহেবা জামে মসজিদের মিনার ও তোরণ
মাইসাহেবা জামে মসজিদের তোরণ ও দুটি মিনার।
ছবি: Rayhan Mahmud · CC BY-SA 4.0 · উৎস

কীভাবে যাবেন: শহরের যেকোনো জায়গা থেকে রিকশা বা অটোতে “মাইসাহেবা মসজিদ” বললেই হবে; সরকারি কলেজের পাশে।

৪. পৌনে তিন আনী জমিদারবাড়ি ও রংমহল (শেরপুর শহর)

অবস্থানশেরপুর শহর, গোপীনাথ-অন্নপূর্ণা মন্দিরের পাশে
জমিদারসত্যেন্দ্র মোহন চৌধুরী ও জ্ঞানেন্দ্র মোহন চৌধুরী
অবস্থামূল ভবন এখনো দাঁড়িয়ে, তবে জীর্ণ

শহরের জমিদারবাড়িগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে ভালোভাবে টিকে আছে। গ্রিক রীতির কারুকাজ করা স্তম্ভ, চুন-সুড়কির পলেস্তারা আর লোহার রেলিং একে অন্য জমিদারবাড়ি থেকে আলাদা করেছে। বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব কোণে লতাপাতা আর ফুলের নকশায় সাজানো রংমহলে একসময় নাচ-গানের আসর বসত, সামনে শান-বাঁধানো ঘাটের পুকুর (জেলা তথ্য বাতায়ন)। “পৌনে তিন আনী” নামটি জমিদারির ষোল আনার মধ্যে এই শরিকের ভাগ বোঝায়।

শেরপুরের পৌনে তিন আনী জমিদারবাড়ির গ্রিক রীতির স্তম্ভ
গ্রিক রীতির স্তম্ভ আর কারুকাজে সাজানো পৌনে তিন আনী জমিদারবাড়ি।
ছবি: Topu Saha · CC BY-SA 2.0 · উৎস

মনে রাখুন: ভবনটি পুরোনো ও জীর্ণ, ভেতরের অংশ কোনো দপ্তর বা পরিবারের ব্যবহারে থাকতে পারে। ভেতরে ঢোকার আগে অনুমতি নিন, ভাঙা অংশে উঠবেন না।

৫. গোপীনাথ ও অন্নপূর্ণা মন্দির (নবীনগর, শেরপুর শহর)

শহরের নবীনগরে পাঁচ কক্ষের এই মন্দির শেরপুরের স্থাপত্য ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন। পদ্মস্তম্ভ, ফুল-লতাপাতার নকশা করা কার্নিশ আর ডরিক ও গ্রিক রীতির মিশেল এতে চোখে পড়ে। জেলা তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী মন্দিরটি ১৭৮৩ সালে পৌনে তিন আনীর জমিদারদের উদ্যোগে তৈরি। তবে একই পাতায় জমিদারবাড়িকে মন্দিরের “অনেক আগের” বলা হয়েছে, আর উল্লিখিত জমিদারদের সময়ের সঙ্গে ১৭৮৩ সাল মেলে না; তাই সালটি যাচাইসাপেক্ষ। মন্দিরের সামনে পুকুর আর পুকুরপাড়ের তোরণ আছে।

পুকুরপাড় থেকে দেখা গোপীনাথ ও অন্নপূর্ণা মন্দির
পুকুরের ওপার থেকে গোপীনাথ ও অন্নপূর্ণা মন্দির।
ছবি: Topumym · CC BY-SA 4.0 · উৎস

কীভাবে যাবেন ও আচরণ: পৌনে তিন আনী জমিদারবাড়ির পাশেই, তাই দুটি একসঙ্গে দেখা যায়। এটি চালু মন্দির; জুতা খুলে ঢুকুন, পূজার সময় ভেতরে ছবি তোলার আগে পুরোহিত বা কমিটির অনুমতি নিন।

৬. রঘুনাথ জিউর মন্দির ও লোকনাথ মন্দির (শেরপুর শহর)

বেদির ওপর স্থাপিত এই মন্দিরগুলোর প্রতিমার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে; দেয়াল, কার্নিশ আর স্তম্ভে নানা রঙের ফুল-লতাপাতার নকশা (জেলা তথ্য বাতায়ন)। বাংলাপিডিয়ার সদর উপজেলা নিবন্ধে রঘুনাথ জিউর মন্দিরের কাল দেওয়া হয়েছে ১৭৭১ সাল। দুটি মন্দিরই গোপীনাথ মন্দিরের কাছাকাছি, শহরের পুরোনো অংশে।

৭. নয়আনী জমিদারবাড়ির স্থান ও নাটমন্দির (জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এলাকা)

শেরপুরের সবচেয়ে বড় জমিদার পরিবার নয়আনীদের বাড়ি ছিল আজকের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয় আর জেলা জজ আদালতের জায়গায়। বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী আঠারো শতকের শেষ বা উনিশ শতকের শুরুতে তৈরি বাড়িটি ১৯৪৭-এর পর পরিত্যক্ত হয়, পরে কলেজের ছাত্রাবাস ও প্রশাসনিক দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নব্বইয়ের দশকে মূল ভবন ভেঙে নতুন দপ্তর তৈরি হয়, পাশের রংমহল ভাঙা হয় ২০০৩ সালে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ২০১৪ সালে জায়গাটিকে প্রত্নস্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

বাংলাপিডিয়ায় এখানকার নাটমন্দিরকে উনিশ শতকের চীনা রীতির কারুকাজ করা কাঠের স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; এর বর্তমান অবস্থা আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। সত্যি বলতে, মূল জমিদারবাড়ির প্রায় কিছুই আর দেখার মতো অবশিষ্ট নেই; এটি মূলত ইতিহাসের জায়গা। সরকারি দপ্তর এলাকা বলে ছবি তোলার আগে নিরাপত্তাকর্মীদের অনুমতি নিন।

৮. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য: ভিক্টোরিয়া একাডেমি ও জি. কে. পাইলট স্কুল

নয়আনী জমিদারদের অর্থে চলা স্কুলটি ১৮৮৭ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার জুবিলি উপলক্ষে উচ্চ বিদ্যালয় হয়, নাম ভিক্টোরিয়া একাডেমি; জেলা বাতায়ন জানায়, পুরোনো ভবনটি আর নেই। ১৯১৯ সালে জমিদার গোবিন্দ কুমার চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত জি. কে. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্রিটিশ ধাঁচের ইটের ভবন এখনো শহীদ দারোগ আলী পৌর পার্কের পশ্চিম পাশে দাঁড়িয়ে, যা সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় আছে। দুটিই চালু বিদ্যালয়, তাই ক্লাস চলার সময় ভেতরে না ঢুকে বাইরে থেকে দেখাই ভালো।

৯. শাহ কামালের মাজার ও কসবার মোগল স্মৃতি (শেরপুর শহর)

শাহ কামালের মাজার: বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিমে কামারের চর রোডের পাশে। সদর উপজেলা তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী দরবেশ শাহ কামাল সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে, ১৫০৩ সালে, মুলতান থেকে এ অঞ্চলে আসেন। লোকমুখে প্রচলিত, কসবার মোগল প্রশাসকেরা কাজীগলির পশ্চিমে তাঁকে জায়গা দান করেন। বাংলা উইকিপিডিয়ায় মাজারের পাশে “১৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ” লেখা আছে, তবে তারিখটি কিসের, তা স্পষ্ট নয়।

কসবা: মোগল আমলে শেরপুর পরগনার প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল শহরের কসবা এলাকা। মোগলবাড়ী মসজিদ ও পুকুর, কাজীগলি মসজিদ, কাচারীপাড়ার মতো নামে সেই সময়ের স্মৃতি টিকে আছে। কোন মসজিদটি মূল মোগল স্থাপনা আর কোনটি পরে নতুন করে বানানো, তা নিশ্চিত নয়; স্থানীয় মুসল্লিদের কাছে জেনে নিন।

১০. শের আলী গাজীর দরগা (গাজীর খামার, সদর)

অবস্থানগিদ্দাপাড়া ফকিরবাড়ি, গাজীর খামার ইউনিয়ন, শেরপুর সদর
দূরত্বশহরের থানা মোড় থেকে প্রায় ১০ কিমি (উপজেলা বাতায়নের দর্শনীয় স্থান তালিকা; ঐতিহ্য পাতায় ১২ কিমি)
যাতায়াতথানা মোড় থেকে রিকশা বা অটোরিকশা

যাঁর নামে জেলার নাম, সেই শের আলী গাজীর কবর। সদর উপজেলা তথ্য বাতায়নের বিবরণ অনুযায়ী ক্ষমতা হারিয়ে অজ্ঞাতবাসে গিয়ে তিনি এখানকার এক খামারবাড়িতে আশ্রয় নেন এবং সেখানেই অসুস্থ হয়ে মারা যান। সেই খামারবাড়ি থেকেই এলাকার নাম গাজীর খামার, আর কবরটি গাজীর মাজার বা গাজীর দরগা নামে পরিচিত। এখানে কোনো প্রাচীন স্থাপনা আছে কি না, সে বিষয়ে প্রকাশিত বিবরণ পাওয়া যায়নি।

১১. রুনীগাঁওয়ের গাজীর দরগাহ (নকলা)

নকলার গৌড়দ্বার ইউনিয়নের রুনীগাঁওয়ে রুনী বিবির মাজার, এলাকাটি এখন “দরগাহ বাজার” নামে পরিচিত। নকলা উপজেলা তথ্য বাতায়নে একে মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন বলা হয়েছে, আর জনশ্রুতি অনুযায়ী মোগল পরিবারের রুনী বেগমের নামে গ্রামের নাম। বটগাছে ঘেরা স্থাপনাটি অর্ধনির্মিত ও জরাজীর্ণ। প্রতি বছর ১০ মহররম মাজার প্রাঙ্গণে মেলা, জারি ও বাউল গান আর উরস হয়। জেলা বাতায়ন একে শের আলী গাজীর সঙ্গে সম্পর্কিত দরগা হিসেবেও উল্লেখ করেছে; দুই বিবরণের সম্পর্ক স্পষ্ট নয়।

১২. সুতানাল দিঘি (নালিতাবাড়ী)

নালিতাবাড়ীর কাকরকান্দি ইউনিয়নের শালমারা গ্রামে, উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিমি দূরে, প্রায় ৬০ একর (১৮০ বিঘা) জুড়ে বিস্তৃত প্রাচীন দিঘি; “রানি বিরহিণীর দিঘি” নামেও পরিচিত। লোককাহিনি বলে, এক দিন-রাতে কাটা সুতার সমান লম্বা করে দিঘিটি খোঁড়া হয়েছিল; গারো রাজবংশের এক রানিকে ঘিরেও গল্প আছে। এগুলো জনশ্রুতি, খননের সাল জানা যায় না। এখন একটি সমবায় সমিতি দিঘিটি দেখাশোনা করে, টিকিট কেটে শৌখিন মাছ ধরা যায় (প্রথম আলো, ২০২১)।

১৩. মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্থান

  • সোহাগপুর বীরকন্যা পল্লী ও সৌরজায়া স্মৃতিসৌধ (কাকরকান্দি, নালিতাবাড়ী): ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই এখানে ১৮৭ জনকে হত্যা করা হয় (বাংলাপিডিয়ায় ২৭ জুলাই, ১৮৫ জন)। পুরুষশূন্য গ্রামটি “বিধবাপল্লী” নামে পরিচিত হয়, পরে নাম হয় “বীরকন্যা পল্লী”। ২০২২ সালে এখানে “সৌরজায়া” স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে।
  • নাকুগাঁও গণকবর ও স্মৃতিস্তম্ভ (নালিতাবাড়ী): ১৯৭১ সালের ২৫ মে নাকুগাঁও-ডালু সীমান্তে গণহত্যার স্মৃতি। নাকুগাঁও স্থলবন্দরের কাছে।
  • সূর্যদী (কামারিয়া ইউনিয়ন, সদর): ২৪ নভেম্বর ১৯৭১ গণহত্যা; প্রথম আলোয় ৪৭ জন, বাংলাপিডিয়ায় ৫২ জন নিহত।
  • জগৎপুর (ঝিনাইগাতী): ৩০ এপ্রিল ১৯৭১, ৪২ জন নিহত (প্রথম আলো)।
  • গজনীর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিফলক ও জোলগাঁও বধ্যভূমি (ঝিনাইগাতী): বাংলাপিডিয়ায় উল্লিখিত। গজনী অবকাশ কেন্দ্রে একটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরও আছে।
  • শহীদ দারোগ আলী পৌর পার্ক (শেরপুর শহর): ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ এখানেই মিত্রবাহিনীর অধিনায়ক জগজিৎ সিং অরোরা হেলিকপ্টারে নেমে শেরপুরকে মুক্ত ঘোষণা করেন।
  • শ্রীবরদী: থানার পূর্ব পাশে টাঙ্গাইলের দুই মুক্তিযোদ্ধার জোড়া কবর, আর রাণীশিমুল ইউনিয়নের বালিজুড়ির কাছে রাঙাজান মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থান (উপজেলা তথ্য বাতায়ন)।

এই জায়গাগুলোর বেশির ভাগে কোনো দর্শনার্থী-সুবিধা বা তথ্যফলক নেই, আর অনেকগুলোর সঠিক ঠিকানাও প্রকাশিত নয়। স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে যান, শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বললে সংবেদনশীল থাকুন।

এক দিনে ঐতিহ্য ভ্রমণ: একটি প্রস্তাবিত রুট

  1. সকাল, শহরের ভেতরে: মাইসাহেবা মসজিদ → পৌনে তিন আনী জমিদারবাড়ি ও গোপীনাথ-অন্নপূর্ণা মন্দির → রঘুনাথ জিউর ও লোকনাথ মন্দির → জি. কে. পাইলট স্কুল ও শহীদ দারোগ আলী পৌর পার্ক। রিকশায় দুই-আড়াই ঘণ্টা।
  2. দুপুর: শহরে খাওয়াদাওয়া; শেষ পাতে ছানার পায়েস (কোথায় পাবেন, দেখুন শেরপুরের বিখ্যাত খাবার)।
  3. বিকেল: সিএনজি রিজার্ভ নিয়ে গড়জরিপা (বারদুয়ারী মসজিদ ও জরিপ শাহের মাজার), অথবা ঝিনাইগাতীর পথে ঘাগড়া খান বাড়ি মসজিদ। দুটি দুই দিকে, তাই সময় কম থাকলে একটি বেছে নিন।

গজনী বা মধুটিলার সঙ্গে মিলিয়ে দুই দিনের ভ্রমণ সাজাতে দেখুন শেরপুর ভ্রমণ পরিকল্পনা ও খরচ। জরুরি প্রয়োজনে থানা ও হাসপাতালের নম্বর পাবেন শেরপুরের জরুরি নম্বর লেখায়, আর জুমার দিনে মসজিদ ঘুরতে চাইলে নামাজের সময় দেখে বের হোন।

ঐতিহাসিক স্থানে যাওয়ার আগে

  • মসজিদ, মন্দির আর মাজারে শালীন পোশাক পরুন; নামাজ, পূজা বা উরসের সময় ভিড় এড়িয়ে চলুন।
  • পুরোনো দেয়াল, শিলালিপি বা কারুকাজে হাত দেবেন না, নাম লিখবেন না; এগুলো একবার নষ্ট হলে আর ফেরানো যায় না।
  • সরকারি দপ্তর আর বসতবাড়ির অংশে ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।
  • বেশির ভাগ জায়গায় তথ্যফলক নেই; স্থানীয় বয়স্ক মানুষের কাছে গল্প শুনুন, তবে লোককাহিনি আর নথিভুক্ত ইতিহাস আলাদা করে মনে রাখুন।

সূত্র

সর্বশেষ হালনাগাদ: অক্টোবর ২০২৬। ঐতিহাসিক স্থাপনার সংস্কার, ভাঙন বা প্রবেশের নিয়ম বদলাতে পারে; যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে জেনে নিন। গড়জরিপা, শের আলী গাজীর দরগা ও রুনীগাঁওয়ের কোনো মুক্ত লাইসেন্সের ছবি পাওয়া যায়নি।

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

আরও পড়ুন

সব দেখুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য

শেরপুরের ইতিহাস: দশকাহনিয়া থেকে শেরপুর, জমিদারবাড়ি, কৃষক বিদ্রোহ ও ১৯৭১

কোচ রাজার গড় দলিপা, ১৪৯১-এর গড়জরিপা, দশকাহনিয়া বাজু, শের আলী গাজী, নয়আনী-পৌনে তিন আনী জমিদার, পাগলপন্থী ও টঙ্ক আন্দোলন, একাত্তরের গণহত্যা ও ৭ ডিসেম্বরের মুক্তি—সূত্রসহ পূর্ণ ইত...

· ১৪ মিনিটে পড়ুন

শেরপুর নিয়ে আপনার গল্প আছে?

ভ্রমণ, ইতিহাস, খাবার বা প্রিয় মানুষ — লিখে ফেলুন, যাচাইয়ের পর প্রকাশ করা হবে।

লেখা শুরু করুন