আমার শেরপুর ৯ মিনিটে পড়ুন
শেরপুরের উত্তরে ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী আর শ্রীবরদীর গারো পাহাড়ঘেঁষা গ্রামগুলোতে শত শত বছর ধরে বাস করছেন গারো (মান্দি), হাজং ও কোচ জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাঁদের নিজস্ব ভাষা, ধর্মবিশ্বাস, উৎসব, খাবার আর পোশাক এই জেলার সংস্কৃতিকে আলাদা রং দিয়েছে। কারা কোথায় থাকেন, কোন উৎসব কখন হয়, টংক আন্দোলনে হাজংদের ভূমিকা কী ছিল আর তাঁদের গ্রামে বেড়াতে গেলে কোন শিষ্টাচার মানবেন, এই লেখায় সব এক জায়গায় পাবেন।
প্রচ্ছদের ছবি: ঝিনাইগাতীর রাংটিয়ায় এক কোচ নারী, বাড়ির উঠানে হাঁস-মুরগির সঙ্গে (এপ্রিল ২০২৪)। ছবি: Nayeem01771031233 · CC BY-SA 4.0 · উৎস
এক নজরে
| প্রধান জনগোষ্ঠী | গারো (মান্দি), হাজং, কোচ; এ ছাড়া হদিসহ আরও কয়েকটি ছোট জনগোষ্ঠী |
|---|---|
| কোথায় | মূলত ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় ও সংলগ্ন সমতল |
| জনসংখ্যা (জনশুমারি ২০২২) | জেলায় নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ ১১,০৮২ জন (জেলার মোট ১৫,০১,৮৫৩ জনের এক শতাংশেরও কম) |
| ধর্ম | গারোদের বেশির ভাগ খ্রিষ্টান (ক্যাথলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ); হাজং ও কোচরা মূলত হিন্দু ঐতিহ্যের, সঙ্গে নিজস্ব দেবদেবী |
| বড় উৎসব | গারোদের ওয়ানগালা (নভেম্বর), হাজংদের নয়া খাওয়া (নবান্ন), দুর্গা ও কালীপূজা |
| দেখার জায়গা | বাবেলাকোনা কালচারাল একাডেমি ও জাদুঘর (শ্রীবরদী), মরিয়মনগর ধর্মপল্লী (ঝিনাইগাতী), রাংটিয়ার কোচ পল্লী |
কারা, কোথায় এবং কতজন
শেরপুর জেলা তথ্য বাতায়নে দেওয়া জনশুমারি ২০২২-এর হিসাবে জেলায় নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ ১১,০৮২ জন। বাংলাপিডিয়ার নালিতাবাড়ী উপজেলা অংশে এখানকার জনগোষ্ঠী হিসেবে গারো, হাজং, হদি ও কোচসহ কয়েকটি জনগোষ্ঠীর নাম আছে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী কোচরা থাকেন ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদীতে, সংখ্যায় প্রায় পাঁচ হাজার। হাজংদের প্রধান বসতির তালিকাতেও এই তিন উপজেলা রয়েছে। গারোদের সবচেয়ে বড় বসতিগুলোর মধ্যে নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতীর নাম আছে।
তবে সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন হিসাবও আছে। ঝিনাইগাতীর মরিয়মনগর ধর্মপল্লীর অধীনেই শেরপুরের তিন উপজেলা আর জামালপুরের বকশীগঞ্জ মিলিয়ে ৪৭টি গারো গ্রামে প্রায় ২২ হাজার খ্রিষ্টান গারোর বাস (বিডিনিউজ২৪, নভেম্বর ২০২৪)। এই হিসাবে জামালপুরের অংশও ধরা আছে, তবু সংখ্যাটি জনশুমারির চেয়ে অনেক বেশি। জনগোষ্ঠীর সংগঠনগুলোও প্রায়ই সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি সংখ্যার কথা বলে। তাই সংখ্যাগুলোকে আনুমানিক ধরে নেওয়াই ভালো।
পরিচয় নিয়ে একটি কথা: সরকারি নথিতে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ লেখা হয়, আর অনেক সংগঠন নিজেদের ‘আদিবাসী’ বলে পরিচয় দেয়। গারোরা নিজেদের ‘মান্দি’ বা ‘আচিক মান্দি’ বলতে পছন্দ করেন। বাংলাপিডিয়াও লিখেছে, ‘গারো’ নামটি অন্যদের দেওয়া এবং অনেকের কাছে তা আপত্তিকর।
গারো (মান্দি)
সমাজ ও ভাষা
গারো সমাজ মাতৃসূত্রীয়। সন্তানেরা মায়ের গোত্রনাম পায়, সম্পত্তির উত্তরাধিকার চলে মায়ের দিক থেকে। সাধারণত পরিবারের ছোট মেয়েকে ‘নকনা’ বা উত্তরাধিকারী কন্যা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। বাংলাপিডিয়া জানাচ্ছে, এখন বাবা-মা জীবদ্দশায় দলিল করে ছেলেদেরও জমির ভাগ দেন। নিজেদের মধ্যে গারোরা কথা বলেন নিজস্ব আচিক (মান্দি) ভাষায়। বাইরে ও স্কুলে বাংলা ব্যবহার হয়।
ধর্ম
গারোদের ঐতিহ্যবাহী ধর্ম ছিল প্রকৃতিনির্ভর, যার পুরোহিতকে বলা হয় ‘খামাল’। এখন তাঁদের বেশির ভাগ খ্রিষ্টান: রোমান ক্যাথলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ, এরপর ব্যাপটিস্ট, আর অল্প সংখ্যায় চার্চ অব বাংলাদেশ ও সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট। শেরপুরের সীমান্ত এলাকায় তাই অনেক গির্জা আর মিশন স্কুল চোখে পড়ে। ধর্ম বদলালেও খামালের মন্ত্রপাঠসহ পুরোনো রীতির অনেকটা উৎসবে টিকে আছে।
ওয়ানগালা: গারোদের সবচেয়ে বড় উৎসব
ওয়ানগালা মূলত নবান্ন বা ফসল তোলার উৎসব। শস্যদেবতা মিসি সালজংকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নতুন ফসল উৎসর্গ করা হয়। শেরপুরে সবচেয়ে বড় আয়োজনটি হয় ঝিনাইগাতীর মরিয়মনগর সাধু জর্জের ধর্মপল্লীতে। ধর্মপল্লীর পুরোহিতের ভাষ্যে, সেখানে ১৯৮৫ সাল থেকে ওয়ানগালা হয়ে আসছে। ২০২৫ সালে উৎসব চলেছিল ২১ থেকে ২৩ নভেম্বর, তিন দিন, মরিয়মনগর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে। প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকার কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’রোজারিও।
উৎসবের মূল আচার ‘থক্কা’ ও শস্য উৎসর্গ। এতে খামাল মন্ত্র পড়ে নতুন ফসল নিবেদন করেন। সঙ্গে থাকে দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রার্থনা, গারো ভাষায় গান ও নাচ, ঐতিহ্যবাহী খাবার রান্নার প্রতিযোগিতা আর পোশাক-পিঠার মেলা। স্থানীয় ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের এক নেতা বিডিনিউজ২৪কে বলেছেন, ওয়ানগালা গারোদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব।
ছবি: Biplob Rahman-BD · CC BY-SA 3.0 · উৎস
পোশাক
উৎসবের দিনে গারো নারীরা পরেন রঙিন ‘দকমান্দা’ আর ‘দকশাড়ি’, কোমরে ‘রিকমাচু’ নামের বিছা। কেউ কেউ মাথায় পরেন মোরগের পালকে তৈরি ‘দামি’ গোঁজা সাজানো পাগড়ি ‘খুতুপে’ (সময়ের কণ্ঠস্বর, নভেম্বর ২০২৫)। প্রতিদিনের জীবনে নারীরা শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজ আর পুরুষেরা লুঙ্গি, প্যান্ট-শার্ট পরেন। ঐতিহ্যবাহী পোশাক বেশি দেখা যায় উৎসব আর পারিবারিক অনুষ্ঠানে।
খাবার
প্রধান খাবার ভাত, সঙ্গে মাছ বা মাংসের তরকারি, ডাল ও সবজি। গারোদের প্রিয় শুঁটকি, বিশেষ করে ভাটি অঞ্চলের পুঁটি শুঁটকি। ঐতিহ্যবাহী রান্নায় শূকরের মাংস, বাঁশকোড়ল, মাশরুম, কচ্ছপ ও কুঁচিয়ার মতো উপকরণ থাকে। রান্নায় সোডার ব্যবহারও প্রচলিত। উৎসব আর অতিথি আপ্যায়নে ঘরে তৈরি চালের পানীয় পরিবেশন করা হয়।
হাজং
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী শেরপুরে হাজংদের প্রধান বসতি শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীতে। দেশে তাঁদের মোট সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি নয় বলে বাংলাপিডিয়ার অনুমান। প্রচলিত বিশ্বাস হলো, তাঁদের আদি নিবাস ছিল আসামের কামরূপের হাজো অঞ্চল। সেখান থেকেই ‘হাজং’ নামের উৎপত্তি।
ভাষা ও ধর্ম
হাজংদের নিজস্ব ভাষা আছে, তবে আলাদা বর্ণমালা নেই। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে তাঁরা অসমিয়া হরফে লেখেন, আর শিশুরা স্কুলে বাংলায় পড়ে। ধর্মে তাঁরা হিন্দু ঐতিহ্যের অনুসারী। দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কামাখ্যা ও মনসার পূজা করেন, সঙ্গে আছেন পারিবারিক দেবতা গাঙদেও, পিঠাদেও ও হাওয়াদেও। প্রতিটি বাড়িতে সন্ধ্যার পূজার জন্য ছোট একটি ‘দেওঘর’ থাকে। গ্রামের প্রধানকে বলা হয় ‘গাঁওবুড়া’। হাজং সমাজ পিতৃতান্ত্রিক।
নয়া খাওয়া ও অন্যান্য উৎসব
দুর্গাপূজা ও কালীপূজায় হাজং গ্রামে সমবেত উৎসব হয়। পৌষ ও চৈত্রের শেষ দিনে নারীরা বিশেষ পিঠা বানান। প্রায় হারিয়ে যেতে বসা নবান্ন উৎসব ‘নয়া খাওয়া’ ২০২৫ সালের ২২ নভেম্বর নালিতাবাড়ীর কয়রাকুড়ি গ্রামের হাজংপাড়ায় পালন করা হয়। আয়োজন করেছিল জাতীয় হাজং সংগঠনের শেরপুর জেলা শাখা। বাস্তুপূজা দিয়ে শুরু হয়ে শস্যদেবতাকে নতুন ধান নিবেদন করা হয়। খাওয়ানো হয় বিন্নি ধানের ‘বিচি ভাত’, নানা তরকারি আর মাষকলাইয়ের ডাল। সংগঠনের জেলা সভাপতি সুকুমার হাজং দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, হাজংদের নিজস্ব ভাষা আর সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে। নতুন প্রজন্মকে চেনাতেই এই আয়োজন।
পোশাক ও খাবার
হাজং নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘পাথিন’: তাঁতে বোনা ডোরাকাটা কাপড়, মাপে প্রায় সাড়ে চার ফুট বাই পৌনে চার ফুট। শীতে গায়ে দেন নিজেদের বোনা চাদর ‘আর্গন’, আর আমন ধান কাটার সময় কোমরে বাঁধেন ‘বানং’। প্রধান খাবার ভাত, মাছ খুব প্রিয়, আর বিন্নি চালের খাবার উৎসবের অংশ। গরু ও মহিষের মাংস তাঁরা খান না।
টংক আন্দোলন: হাজংদের সংগ্রামের ইতিহাস
ব্রিটিশ আমলে বৃহত্তর ময়মনসিংহে ‘টংক’ নামে এক খাজনা-প্রথা চালু ছিল। এতে জমির খাজনা দিতে হতো ধানে, আর ফসল ভালো হোক বা খারাপ, নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান জমিদারকে দিতেই হতো। এই প্রথার বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহের নেতৃত্বে ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে কৃষক আন্দোলন শুরু হয়। তার প্রথম সারিতে ছিলেন হাজং কৃষকেরা। আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ছিল নেত্রকোনার দুর্গাপুর-সুসং অঞ্চল। শেরপুরের লাগোয়া এই গারো পাহাড় জনপদের হাজংরা এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। বাংলাপিডিয়া জানায়, জমিদারদের বিরুদ্ধে ‘হাতিখেদা’ বিদ্রোহ আর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও হাজংদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল।
১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি দুর্গাপুরের বহেরাতলী গ্রামে সশস্ত্র বাহিনী আন্দোলনকর্মী লংকেশ্বর হাজংয়ের স্ত্রী কুমুদিনী হাজংকে তুলে নিতে আসে। রাশিমণি হাজংয়ের নেতৃত্বে গ্রামবাসী বাধা দিলে গুলি চলে। তাতে রাশিমণি ও সুরেন্দ্র হাজংসহ কয়েকজন নিহত হন। রাশিমণিকে তাই ‘হাজং মাতা’ বলা হয়। আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী কুমুদিনী হাজং ২০২৪ সালের মার্চে ৯২ বছর বয়সে মারা যান। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলোপের আইন পাস হলে টংক প্রথারও অবসান হয়। কিন্তু পরের দমন-পীড়নে বহু হাজং পরিবার দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়।
ছবি: Raiyan · CC BY 3.0 · উৎস
কোচ
বাংলাপিডিয়ার তথ্যে কোচরা বাংলাদেশের প্রাচীনতম জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। একসময় কোচবিহার থেকে এসে তাঁরা বৃহত্তর ময়মনসিংহে বসতি গড়েন। এখন শেরপুরের ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদীতে প্রায় পাঁচ হাজার কোচের বাস। ঝিনাইগাতীর রাংটিয়া এলাকার কোচপল্লী সবচেয়ে পরিচিত।
কোচ সমাজ আটটি ‘ভাগে’ বিভক্ত: ওয়ানাং, হরিগাইয়া, সাতপাড়ি, দশগাইয়া, চাপ্রা, তিনথেকিয়া, শংকর ও মারগান। প্রতিটি ভাগে আবার কয়েকটি গোত্র বা ‘নিকিনি’ আছে, আর একই নিকিনিতে বিয়ে নিষিদ্ধ। সমাজ পিতৃতান্ত্রিক, সম্পত্তি পান ছেলেরা। তবে সন্তানেরা মায়ের গোত্রের পদবি পায়।
কোচদের নিজস্ব ভাষা আছে, কিন্তু লিখিত বর্ণমালা নেই। এনডেঞ্জারড ল্যাঙ্গুয়েজেস প্রজেক্ট কোচ ভাষাকে বিপন্ন ভাষার তালিকায় রেখেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী কোচ গ্রামে দৈনন্দিন কথাবার্তায় এই ভাষাই চলে, তবে বাজার, অফিস বা অন্যদের সঙ্গে কথা হয় বাংলায়। ধর্মে কোচরা নিজেদের হিন্দু পরিচয় দেন। দুর্গা, কালী, সরস্বতী ও লক্ষ্মীর পূজা করেন, সঙ্গে আছে নিজস্ব দেবতা ঋষি ও তাঁর স্ত্রী যোগমায়া এবং দেবী কামাখ্যা। পূজা পরিচালনা করেন ‘দেউসী’ ও ‘আজেং’ নামের পুরোহিতেরা।
কোচ নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের নাম ‘লেফেন’। বিবাহিত নারীরা সিঁথিতে সিঁদুর আর হাতে শাঁখা পরেন। প্রধান খাবার ভাত, মাছ-মাংস দুটোই চলে, তবে গরুর মাংস খান না। উৎসবে পিঠা আর পায়েস বানানো হয়। কোচদের বেশির ভাগ কৃষিজীবী, অনেকের নিজের জমি নেই।
বাবেলাকোনা কালচারাল একাডেমি
শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তে রাজার পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঢেউফা নদীর পাড়ে বাবেলাকোনা গ্রাম। এখানে গারো, হাজং ও কোচ তিন জনগোষ্ঠীরই বাস। জেলা তথ্য বাতায়নের বর্ণনায় এখানে আছে বাবেলাকোনা কালচারাল একাডেমি, ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (টিডব্লিউএ) কার্যালয়, জাদুঘর, লাইব্রেরি, গবেষণা বিভাগ ও মিলনায়তন। এসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও চর্চার কেন্দ্র। গ্রামে মিশনারি প্রাথমিক ও উচ্চবিদ্যালয় এবং কারুকাজ করা গির্জা ও মন্দিরও আছে।
শেরপুর শহর থেকে কর্ণঝোড়া বাজার প্রায় ৩৪ কিমি। শহরের খোয়ারপাড় থেকে সিএনজিতে শ্রীবরদী, সেখান থেকে অটোতে কর্ণঝোড়া বাজার। রাজার পাহাড় থেকে বাবেলাকোনা প্রায় ২ কিমি (রূপালী বাংলাদেশ, জুলাই ২০২৫)। একাডেমি ও জাদুঘর খোলার সময় বা প্রবেশ ফির কোনো প্রকাশিত তথ্য আমরা পাইনি। যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিন। এই এলাকার বনে বন্য হাতির চলাচল আছে, তাই সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসুন।
বেড়াতে গেলে যে শিষ্টাচার মানবেন
- গ্রাম কোনো দর্শনীয় বস্তু নয়। মানুষের বাড়ি, উঠান বা রান্নাঘরে আমন্ত্রণ ছাড়া ঢুকবেন না।
- ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন, বিশেষ করে নারী, বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের। কেউ ‘না’ বললে ছবি তুলবেন না, আর অনুমতি ছাড়া কারও ছবি সামাজিক মাধ্যমে দেবেন না।
- উৎসব, পূজা বা গির্জার প্রার্থনার সময় দূর থেকে নীরবে দেখুন। আয়োজকেরা না ডাকলে আচারের মাঝখানে ঢুকবেন না।
- সম্মানজনক শব্দ ব্যবহার করুন। ‘উপজাতি’ বা ব্যঙ্গাত্মক শব্দের বদলে মানুষের নিজের পছন্দের নাম বলুন, যেমন মান্দি, হাজং, কোচ।
- খাবার বা পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করলে নিজের রুচি ও ধর্ম অনুযায়ী ভদ্রভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করুন। কারও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে মন্তব্য করবেন না।
- হাতে বোনা কাপড় বা হস্তশিল্প কিনতে চাইলে সরাসরি কারিগরের কাছ থেকে ন্যায্য দামে কিনুন।
- উৎসবের মেলায় গেলে স্থানীয় আয়োজকদের নিয়ম মেনে চলুন। আবর্জনা ফেলবেন না, জোরে গান বাজাবেন না।
- সীমান্ত এলাকায় জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন। বিজিবির নির্দেশ মেনে চলুন, সীমান্তের দিকে যাবেন না।
কখন যাবেন
সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখার সবচেয়ে ভালো সময় নভেম্বর। এ সময় মরিয়মনগরে ওয়ানগালা হয় আর হাজংদের নয়া খাওয়া পালিত হয়। শীতের শুকনো মৌসুমে (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) পাহাড়ি রাস্তাও চলাচলের জন্য ভালো থাকে। উৎসবের তারিখ প্রতি বছর বদলায়, তাই আয়োজক ধর্মপল্লী বা সংগঠনের ঘোষণা দেখে যাবেন। একই সফরে গজনী অবকাশ কেন্দ্র, মধুটিলা ইকোপার্ক বা পানিহাটা-তারানি ঘুরে আসতে পারেন। পুরো ভ্রমণ সাজাতে দেখুন শেরপুর ভ্রমণ পরিকল্পনা ও বাজেট। রাতে থাকতে হলে দেখুন শেরপুরের হোটেল গাইড। জায়গাগুলো খুঁজে পাবেন মানচিত্রে।
শেরপুরের ইতিহাস, উপজেলা আর দর্শনীয় স্থানের সামগ্রিক পরিচয় পাবেন শেরপুর জেলা গাইডে।
সূত্র
- শেরপুর জেলা তথ্য বাতায়ন: এক নজরে জেলা (জনশুমারি ২০২২; হালনাগাদ ৬ জুলাই ২০২৬); দর্শনীয় স্থান (রাজার পাহাড় ও বাবেলাকোনা)
- বাংলাপিডিয়া: Garo, The, Hajongs, Koch, Nalitabari Upazila
- বিডিনিউজ২৪: নিজেদের ঐতিহ্য তুলে ধরে ‘ওয়ানগালা’ উৎসবে মাতল গারোরা (২৫ নভেম্বর ২০২৪)
- সময়ের কণ্ঠস্বর: ওয়ানগালা উৎসবে বর্ণিল শেরপুরের গারোপল্লী (২৩ নভেম্বর ২০২৫)
- দেশ রূপান্তর: হাজং জনগোষ্ঠীর ‘নয়া খাওয়া’ নবান্ন উৎসব উদযাপিত (২২ নভেম্বর ২০২৫)
- দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (বিডিনিউজ২৪): Tanka movement leader Kumudini Hajong dies (২৩ মার্চ ২০২৪)
- উইকিপিডিয়া: Tanka movement
- এনডেঞ্জারড ল্যাঙ্গুয়েজেস প্রজেক্ট: Koch
- রূপালী বাংলাদেশ: রাজার পাহাড় ও বাবেলাকোনা ভ্রমণ প্রতিবেদন (১৯ জুলাই ২০২৫)
সর্বশেষ হালনাগাদ: অক্টোবর ২০২৬। জনগোষ্ঠীর রীতিনীতি গ্রাম ও পরিবারভেদে আলাদা হতে পারে। বাংলাপিডিয়ার কিছু তথ্য পুরোনো সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে লেখা। কোনো তথ্যে ভুল পেলে বা সংশোধন জানাতে চাইলে আমাদের জানান।