মূল কনটেন্টে যান

বন্য হাতি থেকে নিরাপদ থাকার উপায় ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নিয়ম: শেরপুর গাইড

কৃষি ও প্রকৃতি · ১৭ অক্টোবর ২০২৬

বন্য হাতি থেকে নিরাপদ থাকার উপায় ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নিয়ম: শেরপুর গাইড

আমার শেরপুর ১২ মিনিটে পড়ুন

শেয়ার করুন:

শেরপুরের গারো পাহাড়ে এখন একশোর বেশি বন্য হাতির বাস। শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী আর নালিতাবাড়ীর সীমান্ত গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই হাতির দল ধানক্ষেত আর বাড়ির উঠানে নেমে আসে, প্রায় প্রতি বছর মানুষ ও হাতি দুই পক্ষেরই প্রাণ যায়। হাতির মুখোমুখি হলে কী করবেন আর কী কখনোই করবেন না, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম কী করে, আর হাতির আক্রমণে মৃত্যু, আহত হওয়া বা ফসল-ঘরবাড়ির ক্ষতিতে সরকারি ক্ষতিপূরণ কত, কোথায় কীভাবে আবেদন করবেন, সব এই লেখায়।

প্রচ্ছদের ছবি: শেরপুরের গারো পাহাড়ে মশাল জ্বেলে হাতির দল তাড়াচ্ছেন গ্রামবাসী (নভেম্বর ২০২৫)। ছবি: Bipul Ahmed official · CC BY-SA 4.0 · উৎস

এক নজরে

হাতির সংখ্যাবন বিভাগের হিসাবে শেরপুর সীমান্তে তিনটি দলে একশোর বেশি হাতি (মে ২০২৬)
সংঘাতপ্রবণ এলাকাশ্রীবরদীর বালিজুরী রেঞ্জ, ঝিনাইগাতীর রাংটিয়া রেঞ্জ (গজনী, তাওয়াকোচা), নালিতাবাড়ীর মধুটিলা রেঞ্জ
বেশি ঝুঁকির সময়সন্ধ্যা থেকে রাত; বোরো ধান পাকার সময় (এপ্রিল-মে) আর আমন কাটার মৌসুম থেকে শীত (নভেম্বর-ডিসেম্বর)
নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ৩ লাখ টাকা
গুরুতর আহতসর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা
ফসল, ঘরবাড়ি ও সম্পদের ক্ষতিসর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা
আবেদনের সময়সীমাঘটনার ৬০ দিনের মধ্যে, সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে
হাতি দেখলে বা আক্রমণ হলেনিকটের বিট বা রেঞ্জ অফিস (নিচে নম্বর); আহত হলে ৯৯৯

শেরপুরে হাতি-মানুষের সংঘাত: কোথায়, কখন, কেন

শেরপুরের হাতিগুলো এসেছিল ভারতের মেঘালয় থেকে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া হওয়ার পর তারা আর ফিরে যেতে পারেনি, বহু বছর ধরে বাংলাদেশের গারো পাহাড়েই আছে। বন বিভাগের হিসাবে এখানে তিনটি দলে একশোর বেশি হাতি ঘোরে। বনে হাতির পছন্দের খাবার কমে যাওয়ায় দলগুলো ফসলের মৌসুমে লোকালয়ে নামে; বন বিভাগ তাই বনের ভেতরে হাতির খাবার উপযোগী গাছ লাগাচ্ছে আর খাবার ও পানির ব্যবস্থা করছে বলে জানিয়েছে।

শেরপুরের গারো পাহাড়ের বনে বন্য হাতির দল
শেরপুরের গারো পাহাড়ের বনে বন্য হাতির দল।
ছবি: Amdadphoto · CC BY-SA 4.0 · উৎস

সাম্প্রতিক ঘটনা

  • এপ্রিল ২০২৬, বোরো মৌসুম: একশোর বেশি হাতি কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীর সীমান্তে পাকা ও আধাপাকা ধান মাড়িয়েছে। গান্ধীগাঁও (ঝিনাইগাতী), আন্ধারুপাড়া ও দাওধারা (নালিতাবাড়ী) এলাকার কৃষকেরা রাত জেগে মাচা থেকে পাহারা দিয়েছেন, অনেকে আধাপাকা ধানই কেটে ফেলেছেন।
  • ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫: শ্রীবরদীর বালিজুরী রেঞ্জের মালাকোচা বনে হাতি দেখতে গিয়ে ৩৬ বছরের এক ব্যক্তি পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা যান। তখন ৬–৭টি বাচ্চাসহ ৪০–৪২টি হাতির দল ১০–১৫ দিন ধরে সেখানে ছিল।
  • নভেম্বর ২০২৫: বালিজুরী রেঞ্জ অফিসের আশপাশে ভিডিও বানাতে আসা লোকজন ঢিল ছুড়ে ও চিৎকার করে হাতিকে উত্ত্যক্ত করছিলেন, ফলে হাতি গ্রামে ঢুকে ক্ষতি করছিল বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উঠে আসে। বন বিভাগ মাইকিং করে মানুষকে হাতি উত্ত্যক্ত না করতে বলে।
  • মে ২০২৫: ২০ মে রাতে গজনীর কাছে হাতির আক্রমণে দুজন মারা যান। ২৯ মে গভীর রাতে নালিতাবাড়ীতে নিজের বাড়ির উঠানে হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা যান চুরাতন বেগম; পাঁচ দিন পর ৫ জুন মধুটিলা রেঞ্জ অফিসে তাঁর পরিবারকে ৩ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণের চেক দেওয়া হয়।

প্রথম আলোর হিসাবে ৯ বছরে জামালপুর, শেরপুর ও ময়মনসিংহে হাতির আক্রমণে ৪২ জন মানুষ মারা গেছেন, আর একই সময়ে মারা গেছে ৩২টি হাতি। হাতিও এখানে বিপদে: বৈদ্যুতিক ফাঁদ, মশাল, পটকা আর লাঠি দিয়ে তাড়ানোর সময় হাতি মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

হাতির কাছাকাছি এলাকায় থাকলে: করণীয়

  • সন্ধ্যার আগে ঘরে ফিরুন: হাতি সাধারণত সন্ধ্যা থেকে রাতে বন থেকে বের হয়। এই সময় বনের ধারের রাস্তা, ঝোপ আর ধানক্ষেতের আল দিয়ে একা চলাচল করবেন না।
  • রাতে বের হতেই হলে: দল বেঁধে, জোরালো টর্চ নিয়ে চলুন; মোবাইলে বিট অফিস ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের নম্বর রাখুন।
  • হাতির খবর পেলে আগে জানান: কাছের বিট বা রেঞ্জ অফিস আর গ্রামের এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমকে খবর দিন। প্রতিবেশীদের সতর্ক করুন, শিশু ও বয়স্কদের পাকা বা মজবুত ঘরে রাখুন।
  • হাতি সামনে পড়লে: শান্ত থেকে ধীরে ধীরে উল্টো দিকে সরে যান, হাতির চলার পথ ছেড়ে দিন। বাচ্চাসহ দলের সামনে কখনো যাবেন না; মা হাতি বাচ্চা বাঁচাতে আক্রমণ করে।
  • দূরত্ব রাখুন: হাতি শান্ত মনে হলেও কাছে যাবেন না। বিশাল দেহ সত্ত্বেও হাতি মানুষের চেয়ে দ্রুত দৌড়াতে পারে।
  • ফসলের ক্ষতি হলে: হাতি চলে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত জমি ও ঘরের ছবি তুলে রাখুন, আর দেরি না করে ক্ষতিপূরণের আবেদন করুন (নিচে নিয়ম)।
শেরপুরের গারো পাহাড়ে মশাল জ্বেলে হাতির দল তাড়াচ্ছেন গ্রামবাসী
ওপর থেকে তোলা ছবি: বনের ভেতর হাতির দল, নিচে ডানে মশাল হাতে গ্রামবাসী। এভাবে কাছে গিয়ে তাড়ানো দুই পক্ষের জন্যই বিপজ্জনক।
ছবি: Bipul Ahmed official · CC BY-SA 4.0 · উৎস

যা কখনোই করবেন না

  • হাতি দেখতে বা ভিডিও করতে যাবেন না: ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শ্রীবরদীতে হাতি দেখতে গিয়েই একজন মারা যান। সেলফি, লাইভ বা ভিডিওর জন্য হাতির কাছে যাওয়া প্রাণঘাতী।
  • ঢিল ছোড়া, চিৎকার, পটকা বা কুকুর লেলিয়ে দেওয়া নয়: উত্ত্যক্ত হাতি ক্ষিপ্ত হয়ে গ্রামের দিকে ছোটে। হাতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম এ আজিজের মতে কুকুর লেলিয়ে দিলে হাতি আরও বিরক্ত হয়।
  • বৈদ্যুতিক তারের বেড়া বা ফাঁদ দেবেন না: এটি বেআইনি। বন বিভাগের হিসাবে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালে দেশে ১৪৬টি হাতি হত্যার শিকার হয়েছে, এর মধ্যে ২৬টি বৈদ্যুতিক ফাঁদে; ২০২৬ সালের মে মাসেও নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁওয়ে ধানক্ষেতে বৈদ্যুতিক ফাঁদে জড়িয়ে একটি হাতি আহত হয়। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ অনুযায়ী বৈদ্যুতিক তারের বেষ্টনী দিয়ে বন্যপ্রাণী হত্যা নিষ্ঠুর আচরণ, আর হাতি হত্যার শাস্তি ২ থেকে ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ থেকে ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড।
  • হাতির পথ আটকাবেন না: দল ঘিরে ফেলা, রাস্তা বা সেতুতে ভিড় করে হাতির পথ বন্ধ করা আক্রমণের বড় কারণ।
  • হাতিকে খাবার দেবেন না: খাবারের লোভে হাতি বারবার একই গ্রামে ফিরে আসতে পারে।
  • অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত বনে ঢুকবেন না: বিপদের ঝুঁকি তো আছেই, তার ওপর অনুমতি ছাড়া সরকারি বনে ঢুকে আক্রান্ত হলে আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণও পাওয়া যায় না।

এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) কী করে

এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম বা ইআরটি হলো হাতিপ্রবণ গ্রামের স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের দল, যাঁদের বন বিভাগ প্রশিক্ষণ দিয়েছে। হাতির দল লোকালয়ে ঢোকার আগেই তাঁরা খবর দেন, মানুষকে সরিয়ে নেন আর নিরাপদ দূরত্ব থেকে আলো ও শব্দ দিয়ে হাতিকে বনের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করেন। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড ও হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় দলগুলো গঠন ও প্রশিক্ষণ শুরু হয়, প্রশিক্ষণ এখনো চলছে।

  • ১০ অক্টোবর ২০২৬ শেরপুরে এক সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী গারো পাহাড়ের ৩২টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমকে টর্চসহ হাতি তাড়ানোর সরঞ্জাম দেন। একই অনুষ্ঠানে হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের মোট ১৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়।
  • আপনার গ্রামের ইআরটি সদস্য কারা, তা জানতে নিকটের বিট বা রেঞ্জ অফিসে যোগাযোগ করুন। ইআরটির কাজে বাধা দেবেন না; ২০২৬ সালের মে মাসে নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁওয়ে স্থানীয়দের বাধায় ইআরটি হাতির দলকে নিরাপদে সরাতে পারেনি বলে প্রথম আলো জানায়।

ক্ষতিপূরণ: কত টাকা, কারা পাবেন

হাতির আক্রমণে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা, ২০২১ অনুযায়ী। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ১৫ মার্চ ২০২১ এই বিধিমালা জারি করে (গেজেট প্রকাশ ২৩ মার্চ ২০২১), আর এর মাধ্যমে ২০১০ সালের পুরোনো নীতিমালা বাতিল হয়। বাঘ, হাতি, কুমির, ভালুক বা সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণীর আক্রমণে ক্ষতিপূরণের আবেদন করা যায়।

ক্ষতির ধরনক্ষতিপূরণ
মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে (পরিবার পাবে)৩,০০,০০০ টাকা (তিন লাখ)
গুরুতর আহত ব্যক্তির ক্ষেত্রেঅনধিক ১,০০,০০০ টাকা (এক লাখ)
সরকারি বনাঞ্চলের বাইরে লোকালয়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদের ক্ষতি (ফসল, ঘরবাড়ি ইত্যাদি)অনধিক ৫০,০০০ টাকা (পঞ্চাশ হাজার)

বিধিমালা অনুযায়ী "গুরুতর আহত" মানে এমন আঘাত যাতে জীবনের ঝুঁকি তৈরি হয়, অথবা আহত ব্যক্তি বিকলাঙ্গ, পঙ্গু বা দীর্ঘ সময় শারীরিক যন্ত্রণায় ভোগেন বা স্বাভাবিক কাজ করতে অক্ষম হন। "পরিবার" বলতে স্ত্রী বা স্বামী, মা-বাবা, সন্তান, ভাই-বোন বা যাঁরা আর্থিকভাবে ওই ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল।

কোন ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়

  • সরকারি বনাঞ্চলের বাইরে লোকালয়ে কেউ আক্রান্ত হলে, বা কারও ফসল, ঘরবাড়ি বা সম্পদের ক্ষতি হলে।
  • অনুমতি নিয়ে সরকারি বনে ঢোকা কোনো ব্যক্তি, বা বনে কর্মরত সরকারি কর্মচারী আক্রান্ত হলে।

কোন ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না

  • অনুমতি ছাড়া সরকারি বনে ঢুকে আক্রান্ত হলে।
  • ইচ্ছাকৃতভাবে হাতি বা অন্য বন্যপ্রাণীকে আঘাত করলে বা করতে গেলে, কিংবা অবৈধভাবে শিকার বা আটকের চেষ্টার সময় আক্রান্ত হলে।
  • আক্রান্ত ব্যক্তি বিদেশি নাগরিক হলে।
  • সীমান্তের "নো ম্যানস ল্যান্ড" এলাকায় আক্রান্ত হলে।

বাস্তব সমস্যা: বর্গাচাষিরা অনেক সময় জমির কাগজপত্রের জটিলতায় ফসলের ক্ষতিপূরণ পান না, আর বন বিভাগ বলেছে খাস বা বন বিভাগের জমিতে অবৈধভাবে চাষ করা ফসলের ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায় না। কৃষকেরা বলছেন, ফসলের ক্ষতিপূরণ ক্ষতির তুলনায় কম ও দেরিতে আসে। বর্গাচাষি হলে জমির মালিকের সঙ্গে কথা বলে চুক্তি বা প্রত্যয়নপত্র এবং ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যয়ন সঙ্গে রাখলে আবেদন শক্ত হয়; কী কী লাগবে, রেঞ্জ অফিসে আগে জেনে নিন।

কীভাবে আবেদন করবেন: ধাপে ধাপে

  1. সঙ্গে সঙ্গে জানান: ঘটনার পর দ্রুত নিকটের বিট বা রেঞ্জ অফিসকে জানান, যাতে বন বিভাগ সরেজমিনে দেখে যেতে পারে। কেউ আহত হলে আগে চিকিৎসা; প্রয়োজনে ৯৯৯।
  2. থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি): সংশ্লিষ্ট থানায় ঘটনার জিডি করুন। তিন ধরনের আবেদনেই জিডির সত্যায়িত ফটোকপি লাগে।
  3. কাগজপত্র জোগাড়: নিচের তালিকা দেখুন। সব কপি সত্যায়িত করিয়ে নিন।
  4. নির্ধারিত ফরমে আবেদন: ঘটনার ৬০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ফরেস্ট অফিসের রেঞ্জ কর্মকর্তা বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন জমা দিন। গুরুতর আহতের জন্য ফরম "ক", মৃত্যুর জন্য ফরম "খ", সম্পদের ক্ষতির জন্য ফরম "গ"। ফরমের নমুনা বিধিমালার গেজেটেই আছে, রেঞ্জ অফিসেও পাওয়া যায়।
  5. দেরি হয়ে গেলে: ৬০ দিন পার হলেও পরের ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করা যায়; যৌক্তিক কারণ থাকলে কমিটি সেটি বিবেচনা করতে পারে। তবে দেরি না করাই নিরাপদ।
  6. কমিটির তদন্ত: উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে চার সদস্যের কমিটি (ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা পৌর মেয়র, সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য বা কাউন্সিলর, আর সহকারী বন সংরক্ষক বা রেঞ্জ কর্মকর্তা সদস্য-সচিব) প্রয়োজনে সরেজমিনে তদন্ত করে ৩০ দিনের মধ্যে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে মূল্যায়ন প্রতিবেদন দেয়।
  7. অনুমোদন: বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ১৫ দিনের মধ্যে সুপারিশসহ অতিরিক্ত প্রধান ওয়ার্ডেনের কাছে পাঠান, তিনি ৭ দিনের মধ্যে অর্থ বরাদ্দ ও মঞ্জুরির জন্য প্রধান ওয়ার্ডেনের কাছে পাঠান।
  8. টাকা প্রাপ্তি: মঞ্জুরির পর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ক্রস চেক বা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারে (ইএফটি) টাকা দেন। তাই আবেদনে নিজের ব্যাংক হিসাব নম্বর, শাখা ও ব্যাংকের নাম ঠিকভাবে লিখুন।
  9. আপিল: ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে সিদ্ধান্ত পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করা যায়; আপিল ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা এবং সেই আদেশ চূড়ান্ত।
মধুটিলা ইকোপার্কে হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ
২৬ মে ২০২৫ মধুটিলা ইকোপার্কে হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দেওয়া হচ্ছে।
ছবি: তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি) · পাবলিক ডোমেইন · উৎস

যে কাগজপত্র লাগবে

আবেদনসংযুক্ত কাগজপত্র (বিধিমালার ফরম অনুযায়ী)
গুরুতর আহত (ফরম ক)আবেদনকারীর ২ কপি পাসপোর্ট সাইজের সত্যায়িত ছবি; থানার সাধারণ ডায়েরির সত্যায়িত ফটোকপি; চিকিৎসা সনদের সত্যায়িত ফটোকপি; জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদের সত্যায়িত ফটোকপি; প্রয়োজনীয় অন্য কাগজ ও ছবি
মৃত্যু (ফরম খ)মৃত ব্যক্তির (যদি থাকে) ও আবেদনকারীর ২ কপি করে সত্যায়িত ছবি; থানার সাধারণ ডায়েরির সত্যায়িত ফটোকপি; মৃত্যু সনদের সত্যায়িত ফটোকপি; মৃত ব্যক্তি ও আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদের সত্যায়িত ফটোকপি; প্রয়োজনীয় অন্য কাগজ
ফসল, ঘরবাড়ি বা সম্পদের ক্ষতি (ফরম গ)ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ২ কপি সত্যায়িত ছবি; থানার সাধারণ ডায়েরির সত্যায়িত ফটোকপি; ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ (ছবিসহ); জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদের সত্যায়িত ফটোকপি; প্রয়োজনীয় অন্য কাগজ

প্রতিটি ফরমে আবেদনকারীর নাম, বাবা-মায়ের নাম, জন্মতারিখ, পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর, পেশা, ঠিকানা, কোন বন্যপ্রাণীর আক্রমণ, ঘটনার স্থান-সময়-তারিখ, সংক্ষিপ্ত বিবরণ, দাবির পরিমাণ আর ব্যাংক হিসাবের তথ্য দিতে হয়, শেষে "সত্য পাঠ" অংশে সই বা টিপসই দিতে হয়। মিথ্যা তথ্য দিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

আইনের সর্বশেষ অবস্থা

২০২১ সালের বিধিমালাটি তৈরি হয়েছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর অধীনে। ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল গেজেটে প্রকাশিত নতুন বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ (কার্যকর ৭ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে) ২০১২ সালের আইন বাতিল করেছে; নতুন আইনেও বন অধিদপ্তরকে মানুষ-বন্যপ্রাণীর দ্বন্দ্ব নিরসন ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন আইনের অধীনে আলাদা ক্ষতিপূরণ বিধিমালা আমরা খুঁজে পাইনি। ২০২৬ সালের এপ্রিলেও বন বিভাগের ক্ষতিপূরণ হিসেবে মৃত্যুতে ৩ লাখ, আহত হলে ১ লাখ ও ফসলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকার কথাই প্রতিবেদনে এসেছে, আর অক্টোবর ২০২৬-এও শেরপুরে ক্ষতিপূরণের চেক দেওয়া হয়েছে। নতুন বিধিমালা এলে অঙ্ক বা নিয়ম বদলাতে পারে, তাই আবেদনের আগে রেঞ্জ অফিসে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নিন।

বন বিভাগের অফিস ও জরুরি নম্বর

শেরপুরের গারো পাহাড়ের বন ময়মনসিংহ বন বিভাগের অধীনে। ক্ষতিপূরণের আবেদন জমা দিতে হয় যে রেঞ্জ এলাকায় ঘটনা ঘটেছে, সেই রেঞ্জ অফিসে।

অফিসএলাকাফোন
বালিজুরী রেঞ্জ অফিসশ্রীবরদী (মালাকোচা, কর্ণঝোরা, রাজার পাহাড় এলাকা)০১৯৮০-৭১১১৭০
রাংটিয়া রেঞ্জ (উপজেলা বন অফিস)ঝিনাইগাতী০১৭১৬-২৪৫৮১৯
গজনী বিট অফিসঝিনাইগাতী, রাংটিয়া রেঞ্জ০১৭৫৪-০৬১২০৬
তাওয়াকোচা বিট অফিসঝিনাইগাতী, রাংটিয়া রেঞ্জ০১৩২৮-৯৬৯৬৯২
মধুটিলা রেঞ্জ অফিসনালিতাবাড়ী০১৭৫৯-৬৮২৬৪৮
সহকারী বন সংরক্ষকের কার্যালয়, শেরপুরজেলা০১৯৯৯-০০০৭৫২
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, শেরপুরজেলা০১৯৯৯-০০০৭৫০

ক্ষতিপূরণ কমিটির আহ্বায়ক উপজেলা নির্বাহী অফিসার; আবেদনের অগ্রগতি জানতে ইউএনও কার্যালয়েও যোগাযোগ করতে পারেন:

প্রয়োজনফোন
ইউএনও কার্যালয়, শ্রীবরদী০১৭৮২-৮৯২৬৫৫, ০৯৩২৫৫৬০০২
ইউএনও কার্যালয়, ঝিনাইগাতী০১৭১৩-৬৫১৩২৫, ০২৯৯৭৭৮৩৪০১, ০১৭৮৪-০৯০৮০৬
ইউএনও কার্যালয়, নালিতাবাড়ী০১৭১৩-৬৫১৩২৯, ০৯৩২৪৭৩০০২
জাতীয় জরুরি সেবা (আহত হলে অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ)৯৯৯
সরকারি তথ্য ও সেবা৩৩৩
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, শ্রীবরদী০১৭৩০-৩২৪৫৫৯, ০১৭০১-২৪৮৬৩৮
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ঝিনাইগাতী০১৭০১-২৪৮৬৩৫
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, নালিতাবাড়ী০৯৩২৪৭৩০২৫, ০১৭৩০-৩২৪৫৫৮, ০১৭০১-২৪৮৬৩৭

থানা, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য জরুরি নম্বর পাবেন শেরপুরের জরুরি নম্বর পোস্টে। বন অফিস ও হাসপাতাল কোথায়, দেখুন মানচিত্রে। হাতির চলাচলের পথে ভাঙা সেতু, অন্ধকার রাস্তা বা অন্য কোনো ঝুঁকির কথা জানাতে পারেন এলাকার সমস্যা পাতায়।

পর্যটকদের জন্য

গজনী, মধুটিলা, রাজার পাহাড় বা পানিহাটা বেড়াতে গেলে সন্ধ্যার আগেই ফিরুন, বনের ভেতরের পথে একা ঢুকবেন না, আর হাতির খবর পেলে দেখতে ছুটবেন না। জায়গাভিত্তিক সতর্কতা পাবেন গজনী অবকাশ, মধুটিলা ইকোপার্ক, রাজার পাহাড় ও পানিহাটা-তারানি গাইডে।

সূত্র

সর্বশেষ হালনাগাদ: অক্টোবর ২০২৬। এই লেখা সচেতনতার জন্য, আইনি পরামর্শ নয়। ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ও নিয়ম সরকার বদলাতে পারে; আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ অফিসে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নিন। কোনো নম্বর কাজ না করলে আমাদের জানান।

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

শেরপুর নিয়ে আপনার গল্প আছে?

ভ্রমণ, ইতিহাস, খাবার বা প্রিয় মানুষ — লিখে ফেলুন, যাচাইয়ের পর প্রকাশ করা হবে।

লেখা শুরু করুন